কঙ্কাল
ব্রহ্মপুত্র!
নাব্যতা
সংকটের কারণে ব্রহ্মপুত্রের বুকজুড়ে জেগে
উঠেছে চর।
শুষ্ক মৌসুম শুরুর আগেই শুকিয়ে যাচ্ছে নদের পানি।
হেঁটেই নদ
পাড়ি দিচ্ছে এলাকাবাসী।
গাইবান্ধার
ফুলছড়ির বালাসীঘাটে নৌকায় মুখ বেজাড় করে বসে আছেন
জহুরুল মাঝি।
তাঁর চোখ
অদূরে ব্রহ্মপুত্র নদে জেগে ওঠা
চরের দিকে।
পানির পরিস্থিতি জানতে চাইলে বললেন, কী বলি, কয়েক
দিন আগেই
ভরা নদের
পানির তোড়ে
ব্রহ্মপুত্রের ভাঙনে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল ফুলছড়িবাসী। সেই নদী
এখন শুকিয়ে কঙ্কাল। এভাবে পানি
কমতে থাকলে আর সপ্তাহ দুয়েক পর নৌ চলাচল বন্ধ হয়ে যাবে।
স্থানীয় অন্য
মাঝিমাল্লা, ইজারাদারের লোকজন, নৌশ্রমিক ও
ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা
গেল একই
ধরনের প্রতিক্রিয়া।
এলাকা
ঘুরে তাদের কথার সত্যতাও মিলেছে। বালুচর পেরিয়ে কাছ
থেকে দেখা
গেছে ব্রহ্মপুত্রের দৈন্য দশা। ভরা যৌবনা ব্রহ্মপুত্র নদ ঘাট
ও সংলগ্ন এলাকায় সরু হয়ে
খালের রূপ
নিয়েছে। যাত্রীদের দীর্ঘ বালুচর পেরিয়ে ঘাটে আসা-যাওয়া করতে হচ্ছে। সাধারণ যাত্রীরা মালামাল দীর্ঘপথ মাথায় ও কাঁধে করে বহন করছে।
অন্যদিকে দুর্গম চরাঞ্চল থেকে আসা
নারী-শিশু
ও অসুস্থ রোগীরা পড়ছে বিপাকে।
ফুলছড়ি
নদীতীরের ব্যবসায়ী মোনা রায় জানান, শীত শুরু হতে
না হতেই
ব্রহ্মপুত্র-যমুনার দীর্ঘ ৫০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ছোট-বড়
দুই শতাধিক চর ও ডুবোচর জেগে উঠেছে। ফুলছড়ির জিগাবাড়ী থেকে মননারচর এবং সদর উপজেলার কামারজানি নৌবন্দর থেকে
ফুলছড়ির জামিরা পর্যন্ত চ্যানেল দুটিতে যার বিস্তৃতি। বন্যার সময় উজানের ঢলের
সঙ্গে নেমে
আসা পলি
জমে এ
পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। নদীর বুকে
জেগে ওঠা
বালুচরে কৃষকরা বিভিন্ন ফসলের আবাদও শুরু করেছে।
রেলের
একটি সূত্র জানায়, নাব্য সংকটের কারণে গত ১৬
অক্টোবর থেকে
মালবাহী ওয়াগন ফেরি পারাপার বন্ধ
রাখা হয়েছে বালাসীঘাট-বাহাদুরাবাদ ঘাট
পথে। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এ অচলাবস্থা চলবে অন্তত ছয়
মাস। এই
পথে পাথর,
সরকারি খাদ্যশস্য ও সামগ্রী, রেলের সরঞ্জাম এবং অন্য
মালামাল অন্য
পারে পাঠানো হতো। ড্রেজিং করার
সুযোগ থাকলে কমপক্ষে দুই থেকে
আড়াই কোটি
টাকা আয়
করত রেল।
বর্তমানে এই
পথের পণ্য
ও পাথরবোঝাই রেল ওয়াগনগুলো যমুনা সেতু দিয়ে পারাপার করা হচ্ছে।
মেরিন
সুপার মমতাজুল ইসলাম জানান, ব্রহ্মপুত্র নদের কালাসোনা টার্নিং পয়েন্ট নৌ চ্যানেল ভরাট হয়ে গেছে।
এই পথ
দিয়ে রেলওয়ে ওয়াগন ফেরি চলাচল করত। বালাসীঘাট থেকে
বাহাদুরাবাদ ঘাট
রুটে রেল
ওয়াগনভর্তি বার্জ (ছোট জাহাজ) পারাপারের জন্য ব্রহ্মপুত্র নদে
যতটুকু পানির গভীরতা থাকা দরকার এ মুহূর্তে তা
নেই। ফলে
রেল ওয়াগনবাহী ছোট জাহাজ চলাচল এখন ঝুঁকিপূর্ণ।
এদিকে
নদের পানি
কমার সঙ্গে সঙ্গে গাইবান্ধার ফুলছড়ির প্রায় ১৮টি নৌঘাট অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। অসংখ্য চর ও
ডুবোচর জেগে
ওঠায় ফুলছড়ির অভ্যন্তরীণ নৌরুটগুলো অচল
হয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যে ফুলছড়ি-বালাসী, গজারিয়া-গলনা,
সিংড়িয়া-ঝানঝাইর, গুনভরি-কালাসোনা এবং
আন্তজেলা নৌরুট ফুলছড়িঘাট-গুঠাইল, সৈয়দপুর-রাজিবপুর, তিস্তামুখঘাট-আমতলী এবং তিস্তামুখঘাট-সারিয়াকান্দিসহ ছোট-বড় আরো
১৫টি নৌরুটে চলাচলকারী যাত্রী ও
পণ্যবাহী নৌযান চলাচলে বিঘ্নের সৃষ্টি হয়েছে।
ঘাট শ্রমিক নেতা
রাজু আহমেদ জানান, ডুবোচরের
কারণে নৌকা চালাতে হচ্ছে
খুব সাবধানে।
কারণ ডুবোচরে আটকে গেলে
নৌকার অনেক ক্ষতি হয়,
ভেঙে যায় মেশিনের ফ্যান। বিশেষ করে
পণ্যবোঝাই নিয়ে নৌকা গন্তব্যস্থলে
যাওয়া খুব মুশকিল হয়ে
পড়েছে। তিস্তামুখ
ঘাট থেকে বাহাদুরাবাদ ঘাটে
যেতে আগে সময় লাগত
দুই ঘণ্টা।
কিন্তু পানি শুকিয়ে যাওয়ার
কারণে নৌকা ঘুরে ঘুরে
যেতে এখন সময় লাগছে
তিন থেকে সাড়ে তিন
ঘণ্টা।
ফুলছড়ি উপজেলা চেয়ারম্যান
হাবিবুর রহমান জানান, দীর্ঘদিন
ধরে ব্রহ্মপুত্র ও যমুনা
নদীর ডেজিং না হওয়ায়
পানির ধারণ ক্ষমতা কমে
গেছে। বর্ষা
এলেই পানি নদীর দুই
কূল উপচে পড়ে। এর ফলে
ভয়াবহ বন্যা ও ভাঙনের
কবলে পড়ে মানুষ। অন্যদিকে শুকনো
মৌসুমে নদীগুলো পানিশূন্য হয়ে
পড়ে। এ
কারণে নদীর পানির ওপর
নির্ভরশীল এ অঞ্চলের হাজার
হাজার হেক্টর জমি সেচ
সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়। ফসল উৎপাদনের
ক্ষেত্রে এ অঞ্চলের কৃষক
নতুন সংকটের মুখে পড়ে।
গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন
বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আবদুল
আউয়াল বলেন, এ বছর
ব্রহ্মপুত্র নদে ছয়
থেকে আট ফুট উঁচু
পলি জমেছে।
উজান থেকে নেমে আসা
পানির সঙ্গে পলি এসে
আর
ফিরে যেতে না পারায়
এ
এলাকার নদীগুলো পলিযুক্ত হয়ে
পড়েছে। নদীর
তলদেশ উঁচু হয়ে পড়ায়
পানি প্রবাহ হারিয়েছে বলেও
তিনি জানান।
সূত্র - কালের কন্ঠ।


0 comments:
Post a Comment