খাবার মানেই আতঙ্ক
সাঈদুর রহমান
রিমন
বেঁচে
থাকার প্রধান মৌলিক চাহিদা ‘খাবার’ খেতে বসলেই মনে প্রশ্ন জাগে, কী খাচ্ছি।
খাবারের নামে ভেজালের বিষ নয় তো? এমন সন্দেহ, প্রশ্ন আর উদ্বেগ-আতঙ্কের মধ্যেই চলছে
সবার খাওয়াদাওয়া। খাদ্যপণ্যে বেশুমার ভেজালের পরিণতিতে শরীরে বাসা বাঁধছে জটিল রোগবালাই।
অকালমৃত্যু পর্যন্ত ঘটছে। এ ছাড়া বিকলাঙ্গ শিশুর জন্ম নেওয়া, অন্ধত্ব, ক্যান্সার, হেপাটাইটিস,
কিডনি ও লিভারের জটিলতাসহ ১৫টি কঠিন রোগে আক্রান্ত হচ্ছে ভেজাল খাদ্যভোগী মানুষ।
ভেজালের
বিষময় খাদ্যসামগ্রীর কারণে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে শিশুদের জীবন। গাভীর দুধ থেকে
শুরু করে বিদেশি গুঁড়োদুধ, উন্নত প্যাকেটের জুস, নুডলস, চিপস, আইসক্রিম সবকিছুই ভেজালময়।
বাজারের ফল-ফলারি পর্যন্ত বিষে ভরা। প্রাকৃতিক শাক-সবজির নামে সরাসরি কীটনাশক সেবনেরই
নজির সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নানাভাবে খাদ্যে ভেজাল বা বিষাক্ত রাসায়নিকের
প্রবেশ ঘটে।
এর সামান্য প্রাকৃতিকভাবে হলেও বেশির ভাগই অসচেতন কৃষক আর স্বার্থান্বেষী, অতিমুনাফালোভী, অসাধু ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে ঢুকছে। এর মধ্যে কিছু বিষাক্ত রাসায়নিক কৃষিতে ব্যবহারের ফলে পানি, মাটি বা গাছ হয়ে খাদ্যশস্যের মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রবেশ করে। আবার কিছু রাসায়নিক একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী সরাসরি বিভিন্ন ফল, শাক-সবজি, মাছ-মাংস-দুধ, মসলাসহ নানা খাদ্যে প্রয়োগ করে থাকেন। সব ক্ষেত্রেই খাদ্যে ভেজাল মেশানো রুটিন ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। চাল, আটা, লবণ, চিনি, ভোজ্যতেল, আলু, দুধ থেকে শুরু করে রুটি, মিষ্টি, বিস্কুট কোনো কিছুই ভেজালের ছোবল থেকে বাদ যায় না। খাদ্যে রঙের ব্যবহারও চলছে বিপজ্জনকভাবে। একইভাবে কেক, জেলি ও সসে ব্যবহার করা হচ্ছে কৃত্রিম গন্ধ, রাসায়নিক ও বিষাক্ত রং। ভোক্তাদের আকর্ষণ করতে বেশির ভাগ এনার্জি ড্রিঙ্কে ব্যবহার করা হচ্ছে ক্যাফেইন ও উত্তেজক পদার্থ সিলডেনাফিল সাইট্রেট। দুধ-মাছ থেকে শুরু করে ফলমূল পর্যন্ত বেশির ভাগ খাদ্যদ্রব্যে যে বিপজ্জনক রাসায়নিক সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করা হয়, তা হলো ফরমালিন-কার্বাইড। দামে সস্তা ও সহজলভ্য হওয়ায় ব্যবসায়ীরা ফল পাকানোর কাজে কার্বাইডের যথেচ্ছ ব্যবহার করে থাকেন। এক কেজি ক্যালসিয়াম কার্বাইডের মূল্য ৬০-৭০ টাকা মাত্র, যা দিয়ে ১০ টন ফল পাকানো সম্ভব। তবে ব্যবসায়ীরা সাধারণত ৫০ কেজি ফলের জন্য ১০০ গ্রাম ক্যালসিয়াম কার্বাইড ব্যবহার করেন। এত সব কীটনাশক, ফরমালিন, কার্বাইডসহ নানা রাসায়নিক পদার্থে বিষাক্ত হওয়া রসে টইটম্বুর ফলমূল ঘিরে থাকে না মৌমাছির গুঞ্জন। বিষময় পানিতে চাষ করা মাছ ঘিরেও কোনো মাছির আনাগোনা দেখা যায় না। বাস্তবে ফরমালিনের মতো ভয়াবহ ক্ষতিকর কিছুর ধারেকাছেও যায় না মাছি-মৌমাছি। শাক-সবজিসহ বিভিন্ন কৃষিজাত পণ্য উত্পন্নে অনিয়ন্ত্রিতভাবে রাসায়নিক দ্রব্যের ব্যবহার বাড়ছে, যা জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য ভয়াবহ হুমকি হয়ে দেখা দিয়েছে। দেশের সর্বত্র সবজিবাগানে বিভিন্ন রাসায়নিক কীট ও বালাইনাশক ব্যবহার করা হচ্ছে। কীটনাশকের মধ্যে রিনকর্ড, সিমবুন, সুমিসাইডিন, হেপ্টাক্লোর, থায়াডিন, ডিডিটি ইত্যাদি বেশি বিপজ্জনক, যা সরাসরি শাক-সবজিতে প্রয়োগ করা হচ্ছে অহরহ। খাদ্য ও কৃষি সংস্থা এবং বাংলাদেশ সরকারের যৌথ ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত খাদ্য-নিরাপত্তা গবেষণাগারে দেশি-বিদেশি একদল গবেষক ৮২টি খাদ্যপণ্য নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন। রাজধানীর কারওয়ান বাজার, মহাখালী, গুলশান এলাকাসহ আরও বেশ কিছু বড় বাজার থেকে এসব খাদ্যের নমুনা সংগ্রহ করা হয়। এতে গড়ে ৪০ শতাংশ খাদ্যেই মানবদেহের জন্য সহনীয় মাত্রার চেয়ে ২০ গুণ পর্যন্ত বেশি বিষাক্ত উপাদান শনাক্ত হয়। ওই গবেষণার ফলাফল অনুসারে ৩৫ শতাংশ ফল ও ৫০ শতাংশ শাক-সবজির নমুনায় বিষাক্ত নানা কীটনাশকের উপস্থিতি মিলেছে। এ ছাড়া আম ও মাছের ৬৬টি নমুনায় পাওয়া গেছে ফরমালিন। চালের ১৩টি নমুনায় মিলেছে মাত্রাতিরিক্ত বিষক্রিয়াসম্পন্ন আর্সেনিক আর পাঁচটিতে পাওয়া গেছে ক্রোমিয়াম। হলুদের গুঁড়ার ৩০টি নমুনায় ছিল সিসা ও অন্যান্য ধাতু। লবণেও সহনীয় মাত্রার চেয়ে ২০ থেকে ৫০ গুণ বেশি সিসা পাওয়া গেছে। মুরগির মাংস ও মাছে পাওয়া গেছে মানুষের শরীরের জন্য ক্ষতিকর অ্যান্টিবায়োটিকের অস্তিত্ব। এ ছাড়া চারটি প্যাকেটজাত জুসের নমুনায় পাওয়া গেছে বেঞ্জয়িক এসিড, যা স্বাস্থ্যের জন্য চরম বিপজ্জনক। ‘ইমপ্রুভিং ফুড সেফটি অব বাংলাদেশ’ প্রকল্পের সিনিয়র ন্যাশনাল অ্যাডভাইজার অধ্যাপক ডা. শাহ মনির হোসেন বলেন, গবেষণার মাধ্যমে খোদ রাজধানীতেই বিষাক্ত খাদ্যপণ্যের যে ভয়াবহ চিত্র পাওয়া গেছে, তা সরকারের কাছে উপস্থাপন করা হয়েছে। এখন এ বিষয়ে করণীয় ঠিক করার দায়িত্ব সরকারের। গবেষক দলের সূত্র জানায়, ব্রয়লার মুরগি ও চাষ করা রুই-কাতলজাতীয় মাছে অ্যান্টিবায়োটিক পাওয়া গেছে। এ ছাড়া ফরমালিন তো ছিলই। শুঁটকিতেও মিলেছে বিষাক্ত রাসায়নিক। হলুদ ও লবণে সিসাসহ বিভিন্ন ধাতব উপাদান প্রয়োগের মাধ্যমে এগুলো চকচকে ও ভারী করা হয়। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরাও খাদ্যে ভেজাল মেশানোকে জনস্বাস্থ্যের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি হিসেবে দেখছেন। পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের গবেষণা থেকে জানা যায়, শুধু ভেজাল খাদ্য গ্রহণের ফলে প্রতিবছর তিন লক্ষাধিক লোক ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছেন। ডায়াবেটিসে আক্রান্তের সংখ্যা দেড় লাখ, কিডনি রোগে আড়াই লাখ। এ ছাড়া অন্তঃসত্ত্বা মায়ের শারীরিক জটিলতাসহ গর্ভজাত বিকলাঙ্গ শিশুর সংখ্যা প্রায় ১৫ লাখ। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক ও মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. মো. বশির আহমেদ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘ভেজাল খাদ্যপণ্য কিনে আমরা শুধু প্রতারিতই হচ্ছি না, মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতেও রয়েছি। ভেজাল পণ্য আমাদের ক্যান্সার, হেপাটাইটিস, কিডনি ও লিভারের জটিল রোগ সৃষ্টির জন্য দায়ী।’ ভেজাল পণ্যের কায়কারবার : অনুসন্ধানে জানা যায়, রাজধানীর মিরপুর, কামরাঙ্গীর চর, লালবাগ, চকবাজার, যাত্রাবাড়ী, ডেমরা, বাড্ডা, কেরানীগঞ্জ, শনির আখড়াসহ বিভিন্ন এলাকায় ভেজাল শিশুখাদ্যের শত শত কারখানা গড়ে উঠেছে। প্রতিদিন এসব কারখানা থেকে কয়েক কোটি টাকার ভেজাল খাদ্য বিক্রি হচ্ছে। অন্যদিকে রাজধানীর শনির আখড়া, কামরাঙ্গীর চর, কেরানীগঞ্জসহ পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় রয়েছে ভেজাল আইসক্রিম তৈরির অসংখ্য কারখানা। এসব কারখানায় তৈরি ভেজাল খাদ্য খেয়ে প্রতিনিয়ত নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে শিশুরা। বিএসটিআইর এক কর্মকর্তার মতে, বাজারে যেসব পাউরুটি-বিস্কুট পাওয়া যায়, এর অধিকাংশেই ছত্রাক থাকে। অস্বাস্থ্যকর পদ্ধতিতে তৈরি হয় বলে এসব খাদ্যে কৃমিজাতীয় পরজীবীও থাকে। অনেক ক্ষেত্রে নিম্নমানের হোটেলগুলোর তরকারির রং আকর্ষণীয় করতে জর্দারং ও নানা রকম কেমিক্যাল মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার করা হচ্ছে, যা স্বাস্থ্যসম্মত নয়। এ ছাড়া হোটেলের শরবত, ঠাণ্ডা পানি ও লাচ্ছিতে মাছের হিমাগারে ব্যবহূত দূষিত পানি দিয়ে তৈরি বরফ মেশানো হচ্ছে। বেশির ভাগ সয়াবিন তেল তৈরি হচ্ছে সাবান তৈরির পাম অয়েল দিয়ে। বেকারি ও মিষ্টিতে ব্যবহার হচ্ছে বিষাক্ত রং। মরা মুরগি দিয়ে তৈরি করা হচ্ছে সুপ। বিস্কুট, আইসক্রিম, কোল্ড ড্রিঙ্কস, জুস, সেমাই, আচার, নুডলস, মিষ্টিতে দেদার মেশানো হচ্ছে ভেজাল। শিশুখাদ্য সামগ্রীতেও ব্যবহূত হচ্ছে স্যাকারিন, মোম, ট্যালকম পাউডার, পোড়া মবিল, সোডা, নিম্নমানের আটা-ময়দা। ভেজাল মসলা উত্পাদনকারীরা ফাঁকি মরিচের সঙ্গে মেশাচ্ছেন ইটের গুঁড়া। হলুদে দেওয়া হচ্ছে মটরের ডাল, ধনিয়ায় কাঠের গুঁড়া আর পোস্তাদানায় সুজি। ভেজালের প্রবণতা বাড়ছেই : ভেজাল ও রাসায়নিক দ্রব্য মিশ্রিত খাদ্যে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে দেশের মানুষ। ভেজাল প্রতিরোধে সরকারের দায়িত্বশীল সংস্থাগুলো খাদ্য উত্পাদন, বিপণন ও বিক্রয় নিশ্চিত করতে না পারায় দিন দিন বাড়ছে এর প্রবণতা। রাজধানীর উত্তর বাড্ডার একটি বাড়ি থেকে কলেরা ও ডায়রিয়ার চিকিৎসা এবং গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইসিডিডিআরবির নামে উত্পাদিত নকল স্যালাইন কারখানা শনাক্ত করে র্যাব। এর আগে পুরান ঢাকার একটি বাড়ি থেকেও একই ধরনের স্যালাইন কারখানা শনাক্ত করা হয়। অভিযুক্তদের র্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত তাত্ক্ষণিক কিছু জরিমানা ও শাস্তি দিলেও ভেজাল-নকল স্যালাইন উত্পাদন ও বাজারজাত বন্ধ হয়নি মোটেও। জীবন রক্ষাকারী ওষুধজাত দ্রব্য ভেজাল প্রমাণিত হওয়ার পরও শাস্তির মাত্রা সীমিত থাকা নিয়ে প্রশ্ন জেগেছে জনমনে।
সূত্র -
এর সামান্য প্রাকৃতিকভাবে হলেও বেশির ভাগই অসচেতন কৃষক আর স্বার্থান্বেষী, অতিমুনাফালোভী, অসাধু ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে ঢুকছে। এর মধ্যে কিছু বিষাক্ত রাসায়নিক কৃষিতে ব্যবহারের ফলে পানি, মাটি বা গাছ হয়ে খাদ্যশস্যের মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রবেশ করে। আবার কিছু রাসায়নিক একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী সরাসরি বিভিন্ন ফল, শাক-সবজি, মাছ-মাংস-দুধ, মসলাসহ নানা খাদ্যে প্রয়োগ করে থাকেন। সব ক্ষেত্রেই খাদ্যে ভেজাল মেশানো রুটিন ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। চাল, আটা, লবণ, চিনি, ভোজ্যতেল, আলু, দুধ থেকে শুরু করে রুটি, মিষ্টি, বিস্কুট কোনো কিছুই ভেজালের ছোবল থেকে বাদ যায় না। খাদ্যে রঙের ব্যবহারও চলছে বিপজ্জনকভাবে। একইভাবে কেক, জেলি ও সসে ব্যবহার করা হচ্ছে কৃত্রিম গন্ধ, রাসায়নিক ও বিষাক্ত রং। ভোক্তাদের আকর্ষণ করতে বেশির ভাগ এনার্জি ড্রিঙ্কে ব্যবহার করা হচ্ছে ক্যাফেইন ও উত্তেজক পদার্থ সিলডেনাফিল সাইট্রেট। দুধ-মাছ থেকে শুরু করে ফলমূল পর্যন্ত বেশির ভাগ খাদ্যদ্রব্যে যে বিপজ্জনক রাসায়নিক সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করা হয়, তা হলো ফরমালিন-কার্বাইড। দামে সস্তা ও সহজলভ্য হওয়ায় ব্যবসায়ীরা ফল পাকানোর কাজে কার্বাইডের যথেচ্ছ ব্যবহার করে থাকেন। এক কেজি ক্যালসিয়াম কার্বাইডের মূল্য ৬০-৭০ টাকা মাত্র, যা দিয়ে ১০ টন ফল পাকানো সম্ভব। তবে ব্যবসায়ীরা সাধারণত ৫০ কেজি ফলের জন্য ১০০ গ্রাম ক্যালসিয়াম কার্বাইড ব্যবহার করেন। এত সব কীটনাশক, ফরমালিন, কার্বাইডসহ নানা রাসায়নিক পদার্থে বিষাক্ত হওয়া রসে টইটম্বুর ফলমূল ঘিরে থাকে না মৌমাছির গুঞ্জন। বিষময় পানিতে চাষ করা মাছ ঘিরেও কোনো মাছির আনাগোনা দেখা যায় না। বাস্তবে ফরমালিনের মতো ভয়াবহ ক্ষতিকর কিছুর ধারেকাছেও যায় না মাছি-মৌমাছি। শাক-সবজিসহ বিভিন্ন কৃষিজাত পণ্য উত্পন্নে অনিয়ন্ত্রিতভাবে রাসায়নিক দ্রব্যের ব্যবহার বাড়ছে, যা জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য ভয়াবহ হুমকি হয়ে দেখা দিয়েছে। দেশের সর্বত্র সবজিবাগানে বিভিন্ন রাসায়নিক কীট ও বালাইনাশক ব্যবহার করা হচ্ছে। কীটনাশকের মধ্যে রিনকর্ড, সিমবুন, সুমিসাইডিন, হেপ্টাক্লোর, থায়াডিন, ডিডিটি ইত্যাদি বেশি বিপজ্জনক, যা সরাসরি শাক-সবজিতে প্রয়োগ করা হচ্ছে অহরহ। খাদ্য ও কৃষি সংস্থা এবং বাংলাদেশ সরকারের যৌথ ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত খাদ্য-নিরাপত্তা গবেষণাগারে দেশি-বিদেশি একদল গবেষক ৮২টি খাদ্যপণ্য নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন। রাজধানীর কারওয়ান বাজার, মহাখালী, গুলশান এলাকাসহ আরও বেশ কিছু বড় বাজার থেকে এসব খাদ্যের নমুনা সংগ্রহ করা হয়। এতে গড়ে ৪০ শতাংশ খাদ্যেই মানবদেহের জন্য সহনীয় মাত্রার চেয়ে ২০ গুণ পর্যন্ত বেশি বিষাক্ত উপাদান শনাক্ত হয়। ওই গবেষণার ফলাফল অনুসারে ৩৫ শতাংশ ফল ও ৫০ শতাংশ শাক-সবজির নমুনায় বিষাক্ত নানা কীটনাশকের উপস্থিতি মিলেছে। এ ছাড়া আম ও মাছের ৬৬টি নমুনায় পাওয়া গেছে ফরমালিন। চালের ১৩টি নমুনায় মিলেছে মাত্রাতিরিক্ত বিষক্রিয়াসম্পন্ন আর্সেনিক আর পাঁচটিতে পাওয়া গেছে ক্রোমিয়াম। হলুদের গুঁড়ার ৩০টি নমুনায় ছিল সিসা ও অন্যান্য ধাতু। লবণেও সহনীয় মাত্রার চেয়ে ২০ থেকে ৫০ গুণ বেশি সিসা পাওয়া গেছে। মুরগির মাংস ও মাছে পাওয়া গেছে মানুষের শরীরের জন্য ক্ষতিকর অ্যান্টিবায়োটিকের অস্তিত্ব। এ ছাড়া চারটি প্যাকেটজাত জুসের নমুনায় পাওয়া গেছে বেঞ্জয়িক এসিড, যা স্বাস্থ্যের জন্য চরম বিপজ্জনক। ‘ইমপ্রুভিং ফুড সেফটি অব বাংলাদেশ’ প্রকল্পের সিনিয়র ন্যাশনাল অ্যাডভাইজার অধ্যাপক ডা. শাহ মনির হোসেন বলেন, গবেষণার মাধ্যমে খোদ রাজধানীতেই বিষাক্ত খাদ্যপণ্যের যে ভয়াবহ চিত্র পাওয়া গেছে, তা সরকারের কাছে উপস্থাপন করা হয়েছে। এখন এ বিষয়ে করণীয় ঠিক করার দায়িত্ব সরকারের। গবেষক দলের সূত্র জানায়, ব্রয়লার মুরগি ও চাষ করা রুই-কাতলজাতীয় মাছে অ্যান্টিবায়োটিক পাওয়া গেছে। এ ছাড়া ফরমালিন তো ছিলই। শুঁটকিতেও মিলেছে বিষাক্ত রাসায়নিক। হলুদ ও লবণে সিসাসহ বিভিন্ন ধাতব উপাদান প্রয়োগের মাধ্যমে এগুলো চকচকে ও ভারী করা হয়। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরাও খাদ্যে ভেজাল মেশানোকে জনস্বাস্থ্যের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি হিসেবে দেখছেন। পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের গবেষণা থেকে জানা যায়, শুধু ভেজাল খাদ্য গ্রহণের ফলে প্রতিবছর তিন লক্ষাধিক লোক ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছেন। ডায়াবেটিসে আক্রান্তের সংখ্যা দেড় লাখ, কিডনি রোগে আড়াই লাখ। এ ছাড়া অন্তঃসত্ত্বা মায়ের শারীরিক জটিলতাসহ গর্ভজাত বিকলাঙ্গ শিশুর সংখ্যা প্রায় ১৫ লাখ। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক ও মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. মো. বশির আহমেদ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘ভেজাল খাদ্যপণ্য কিনে আমরা শুধু প্রতারিতই হচ্ছি না, মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতেও রয়েছি। ভেজাল পণ্য আমাদের ক্যান্সার, হেপাটাইটিস, কিডনি ও লিভারের জটিল রোগ সৃষ্টির জন্য দায়ী।’ ভেজাল পণ্যের কায়কারবার : অনুসন্ধানে জানা যায়, রাজধানীর মিরপুর, কামরাঙ্গীর চর, লালবাগ, চকবাজার, যাত্রাবাড়ী, ডেমরা, বাড্ডা, কেরানীগঞ্জ, শনির আখড়াসহ বিভিন্ন এলাকায় ভেজাল শিশুখাদ্যের শত শত কারখানা গড়ে উঠেছে। প্রতিদিন এসব কারখানা থেকে কয়েক কোটি টাকার ভেজাল খাদ্য বিক্রি হচ্ছে। অন্যদিকে রাজধানীর শনির আখড়া, কামরাঙ্গীর চর, কেরানীগঞ্জসহ পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় রয়েছে ভেজাল আইসক্রিম তৈরির অসংখ্য কারখানা। এসব কারখানায় তৈরি ভেজাল খাদ্য খেয়ে প্রতিনিয়ত নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে শিশুরা। বিএসটিআইর এক কর্মকর্তার মতে, বাজারে যেসব পাউরুটি-বিস্কুট পাওয়া যায়, এর অধিকাংশেই ছত্রাক থাকে। অস্বাস্থ্যকর পদ্ধতিতে তৈরি হয় বলে এসব খাদ্যে কৃমিজাতীয় পরজীবীও থাকে। অনেক ক্ষেত্রে নিম্নমানের হোটেলগুলোর তরকারির রং আকর্ষণীয় করতে জর্দারং ও নানা রকম কেমিক্যাল মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার করা হচ্ছে, যা স্বাস্থ্যসম্মত নয়। এ ছাড়া হোটেলের শরবত, ঠাণ্ডা পানি ও লাচ্ছিতে মাছের হিমাগারে ব্যবহূত দূষিত পানি দিয়ে তৈরি বরফ মেশানো হচ্ছে। বেশির ভাগ সয়াবিন তেল তৈরি হচ্ছে সাবান তৈরির পাম অয়েল দিয়ে। বেকারি ও মিষ্টিতে ব্যবহার হচ্ছে বিষাক্ত রং। মরা মুরগি দিয়ে তৈরি করা হচ্ছে সুপ। বিস্কুট, আইসক্রিম, কোল্ড ড্রিঙ্কস, জুস, সেমাই, আচার, নুডলস, মিষ্টিতে দেদার মেশানো হচ্ছে ভেজাল। শিশুখাদ্য সামগ্রীতেও ব্যবহূত হচ্ছে স্যাকারিন, মোম, ট্যালকম পাউডার, পোড়া মবিল, সোডা, নিম্নমানের আটা-ময়দা। ভেজাল মসলা উত্পাদনকারীরা ফাঁকি মরিচের সঙ্গে মেশাচ্ছেন ইটের গুঁড়া। হলুদে দেওয়া হচ্ছে মটরের ডাল, ধনিয়ায় কাঠের গুঁড়া আর পোস্তাদানায় সুজি। ভেজালের প্রবণতা বাড়ছেই : ভেজাল ও রাসায়নিক দ্রব্য মিশ্রিত খাদ্যে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে দেশের মানুষ। ভেজাল প্রতিরোধে সরকারের দায়িত্বশীল সংস্থাগুলো খাদ্য উত্পাদন, বিপণন ও বিক্রয় নিশ্চিত করতে না পারায় দিন দিন বাড়ছে এর প্রবণতা। রাজধানীর উত্তর বাড্ডার একটি বাড়ি থেকে কলেরা ও ডায়রিয়ার চিকিৎসা এবং গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইসিডিডিআরবির নামে উত্পাদিত নকল স্যালাইন কারখানা শনাক্ত করে র্যাব। এর আগে পুরান ঢাকার একটি বাড়ি থেকেও একই ধরনের স্যালাইন কারখানা শনাক্ত করা হয়। অভিযুক্তদের র্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত তাত্ক্ষণিক কিছু জরিমানা ও শাস্তি দিলেও ভেজাল-নকল স্যালাইন উত্পাদন ও বাজারজাত বন্ধ হয়নি মোটেও। জীবন রক্ষাকারী ওষুধজাত দ্রব্য ভেজাল প্রমাণিত হওয়ার পরও শাস্তির মাত্রা সীমিত থাকা নিয়ে প্রশ্ন জেগেছে জনমনে।
সূত্র -


0 comments:
Post a Comment