Friday, July 31, 2015

একটি অন্যায় এবং অসহায় বৃষ্টির মৃত্যু নানা প্রশ্ন


বৃষ্টির মৃত্যু নানা প্রশ্ন

রুদ্র মিজান | ২৬ জুলাই ২০১৫, রবিবার, ১২:৫৮ | মতামত: ৩ টি

ছাত্রলীগ নেত্রী বৃষ্টির আত্মহননের জন্য দায়ী একই সংগঠনের নেতা জাহিদ ও অনিক। কিন্তু সংগঠন তাদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়নি। মৃত্যুর আগে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ নেতাদের কাছে বিচার চেয়েছিল বৃষ্টি। কিন্তু কেউ বৃষ্টির পাশে দাঁড়ায়নি। বরং শেষ পর্যন্ত বৃষ্টির হত্যাকারীকে পুরস্কৃত করলো ছাত্রলীগ। ক্ষোভ প্রকাশ করে এভাবেই কথাগুলো বলেছেন ছাত্রলীগ নেত্রী ফাতেমাতুজ জোহরা বৃষ্টির পিতা তোফাজ্জল হোসেন।

সম্প্রতি মজিবুর রহমান অনিককে ছাত্রলীগের মিরপুর বাঙলা কলেজ শাখার সভাপতি করায় এ ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি। ছাত্রলীগ নেত্রী ফাতেমাতুজ জোহরা বৃষ্টির সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক ছিল অনিকের বন্ধু কলেজ ছাত্রলীগের তৎকালীন সভাপতি জাহিদের। একপর্যায়ে শারীরিক সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে তারা। এতে অন্তঃসত্ত্বা হয়ে যায় বৃষ্টি। সে বিয়ের জন্য চাপ দিতে থাকে জাহিদকে। এতেই ক্ষুব্ধ হয় জাহিদ। কোনভাবেই বিয়ে করতে রাজি হয়নি সে। বৃষ্টির পিতা তোফাজ্জল হোসেন জানান, ১৩ই জুন গলায় ফাঁস দেয় বৃষ্টি। তার আগে বিয়ের জন্য চাপ দিলে ক্ষুব্ধ জাহিদ অকথ্য ভাষায় বৃষ্টিকে গালাগাল করে। একইভাবে জাহিদের সুরে তাল মিলিয়ে বৃষ্টিকে অপদস্থ করে অনিক। বৃষ্টির গর্ভে থাকা সন্তান নষ্ট করার জন্যও চাপ দেয় জাহিদ, অনিকসহ তার বন্ধুরা। সন্তান নষ্ট না করলে বৃষ্টিকে প্রাণে মেরা ফেলার হুমকিও দেয় তারা। বাধ্য হয়ে আত্মহত্যার কয়েক সপ্তাহ আগে কাফরুল থানায় একটি জিডি করেছিল বৃষ্টি। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে বৃষ্টির পিতা তোফাজ্জল হোসেনকে ফোনে হুমকি দেয় ছাত্রলীগ নেতা জাহিদ। তোফাজ্জল হোসেন জানান, সেদিন জাহিদ তাকে বলেছিল, ‘আমি ইচ্ছে করলে আপনার পুরো পরিবার ধ্বংস করে দিতে পারি। আপনার মেয়েকে বলেন আমার বিরুদ্ধে করা জিডিটা তুলে নিতে।’ তখনও কিছুই জানতেন না তোফাজ্জল হোসেন। এমনকি বৃষ্টির কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে সেও পিতাকে এড়িয়ে যায়। বৃষ্টি তখন জানিয়েছিল বন্ধুদের মধ্যে সামান্য সমস্যা হয়েছে। ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু ঠিক আর হয়নি। বরং চিরদিনের মতো একমাত্র কন্যাকে হারাতে হয়েছে তোফাজ্জল হোসেনের। তিনি জানান, যেদিন বৃষ্টি গলায় ফাঁস দেয় ওই দিন বিকালে তাদের বাসায় যায় জাহিদ ও অনিক। তারা প্রকাশ্যে অস্ত্র দেখিয়ে পুরো পরিবারকে হুমকি দেয়। এমনকি বিষয়টি নিয়ে বাড়াবাড়ি করলে বৃষ্টিকে মেরে ফেলা হবে বলে শাসায়। জাহিদ ও অনিক চলে যাওয়ার পরেই ১৩২০/১ শেওড়াপাড়ার বাসায় গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করে বৃষ্টি। তাকে উদ্ধার করে মিরপুরের স্থানীয় একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৯শে জুন মারা যায় সে। সন্তানের স্বীকৃতি দিতে অস্বীকার করায় বৃষ্টি আত্মহত্যা করে বলে তার পরিবারের অভিযোগ। এ ঘটনায় বৃষ্টির বাবা তোফাজ্জল হোসেন বাদী হয়ে কাফরুল থানায় মামলা করেন। এতে মজিবুর রহমান অনিক ও বাঙলা কলেজ ছাত্রলীগের তৎকালীন সভাপতি জাহিদসহ সাতজনকে আসামি করা হয়। মামলার অন্য আসামিরা হলো জাহিদ মুন্সি, মো. আলমগীর হোসেন, এ আজিজ তানভীর, শাকিল আহমেদ ও চঞ্চল।
ঘটনার পরপরই জাহিদকে গ্রেপ্তার করা হয়। জাহিদ কারাগারে থাকলেও অনিকসহ অন্য আসামিরা সক্রিয়ভাবে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিচ্ছিল। যদিও এ ক্ষেত্রে পুলিশের বক্তব্য হচ্ছে, তারা পলাতক। শেষ পর্যন্ত অনিককে ছাত্রলীগের বাঙলা কলেজের সভাপতি করায় হতাশ হয়েছেন ছাত্রলীগ নেত্রী বৃষ্টির স্বজনরা। এ বিষয়ে বৃষ্টির পিতা তোফাজ্জল হোসেন বলেন, হত্যাকারীকে সভাপতি করে অপরাধীকে উৎসাহিত করা হলো। বৃষ্টির বিচারের দাবি জানানোর কথা ছাত্রলীগের। কারণ বৃষ্টি ছাত্রলীগের নেত্রী ছিল। কিন্তু ঘটলো উল্টোটা। এখন নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন পুরো পরিবার। তোফাজ্জল হোসেন জানান, বাঙলা কলেজের সাবেক সভাপতি জাহিদকে যেদিন গ্রেপ্তার করা হলো ওই দিন থেকে প্রাণভয়ে একপ্রকার পালিয়ে আছেন তিনি। একা একা কোথাও যেতে পারেন না। সন্ত্রাসীরা তাকে প্রতিনিয়তই হুমকি-ধমকি দিয়ে যাচ্ছে। এ বিষয়ে জিডি করতে চাইলেও কাফরুল থানা পুলিশ তা নেয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি। এখন অনিককে সভাপতি করায় এ আশঙ্কা প্রকট আকার ধারণ করলো বলে জানান তিনি।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা কাফরুল থানার উপপরিদর্শক (এসআই) খন্দকার মনিরুজ্জামান জানান, জাহিদের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক ছিল। তবে বৃষ্টি অন্তঃসত্ত্বা ছিল কি-না তা ময়নাতদন্ত রিপোর্ট হাতে পেলে জানা যাবে। এ ছাড়া বাদীর নিরাপত্তা নিয়ে পুলিশ সচেষ্ট আছে। তবে এ মামলায় বাদী সাহায্য করছেন না জানিয়ে তিনি বলেন, তদন্তে সেভাবে অগ্রগতি হচ্ছে না। আসামিরা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ানোর অভিযোগ মিথ্যা বলে দাবি করেন তিনি।
অনিকের বিরুদ্ধে হত্যা প্ররোচনার অভিযোগ থাকলেও তাকে ছাত্রলীগের বাঙলা কলেজের সভাপতি করা হয়েছে। গত সোমবার ছাত্রলীগের সভাপতি বদিউজ্জামান সোহাগ ও সাধারণ সম্পাদক সিদ্দিকী নাজমুল আলম স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে বাঙলা কলেজের নতুন কমিটি ঘোষণা করা হয়। এতে মজিবুর রহমান অনিককে সভাপতি, সোলায়মান মিয়া জীবনকে সাধারণ সম্পাদক করা হয়েছে। নিহতের স্বজনরা জানান, আত্মহত্যার আগে তিন মাসের অন্তঃসত্ত্বা বৃষ্টি স্থানীয় সংসদ সদস্য ও ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের কাছে জাহিদ ও অনিকের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছিল। কিন্তু নেতারা কোন সমাধান করেননি। বৃষ্টিকে বিয়ে না করতে জাহিদকে নানাভাবে প্ররোচনা দিতো অনিক। শেষ পর্যন্ত অনিককেই সভাপতি করায় ক্ষুব্ধ হয়েছেন বৃষ্টির স্বজনরা।
এ বিষয়ে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি বদিউজ্জামান সোহাগ বলেন, খোঁজ নিয়ে দেখেছি বিষয়টি সঠিক না। তা ছাড়া কেউ অভিযোগ করলেই তা সত্য হয় না। আদালত যতক্ষণ পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে রায় দিচ্ছেন না ততক্ষণ পর্যন্ত তাকে অপরাধী বলা যাবে না। এটি অনিকের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র বলে মন্তব্য করেন তিনি।
মিরপুর বাঙলা কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী ছিলেন ফাতেমাতুজ জোহরা বৃষ্টি। তিনি কাফরুল থানা ছাত্রলীগের ছাত্রীবিষয়ক সম্পাদক ছিলেন। একই দলে রাজনীতি করার কারণেই জাহিদের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে তার।
সূত্র :26 জুলাই 2015,  দৈনিক মানবজমিন

0 comments:

Post a Comment

Advertisement

 

Copyright 2008 All Rights Reserved Revolution Two Church theme by Brian Gardner Converted into Blogger Template by Bloganol dot com