Tuesday, July 28, 2015

অনিয়ম ও দুর্নীতিতে বিপর্যস্ত গাজীপুর বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্ক 


অনিয়ম ও দুর্নীতিতে বিপর্যস্ত

গাজীপুর বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্ক 

ঢাকার অদূরে গাজীপুরে অবস্থিত বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্কের অন্যতম আকর্ষণ এগ ওয়ার্ল্ড। ১০ টাকা প্রবেশ মূল্যে প্রতিদিন হাজারও দর্শনার্থীকে মুগ্ধ করছে সেখানে সংগৃহীত বিভিন্ন প্রাণীর ডিম। কিন্তু কয়েক মাস ধরে এই এগ ওয়ার্ল্ড থেকে অর্জিত অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা হচ্ছে না! কারণ গত ৭ মাস ধরেই এটি চলছে ইজারা ছাড়া। অভিযোগ রয়েছে, ইজারা নেওয়ার কথা বলে পার্কের প্রকল্প পরিচালকের এক স্বজন এগ ওয়ার্ল্ড থেকে অর্জিত লাখ লাখ টাকা তুলে ভোগ করছেন। এই টাকার কোনো হিসাব নেই। বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্কের বর্তমান চিত্র এমনই। শুধু এগ ওয়ার্ল্ডই নয়, নানা অনিয়ম-দুর্নীতিতে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে এই পার্ক।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ২০১৪ সালে ২ কোটি ৭৯ লাখ টাকায় পার্কের মেইন গেট ইজারা নেন কবির হোসেন। এছাড়া পার্কিংয়ের স্থান ৫২ লাখ টাকায় ইজারা দেওয়া হয়। ৭ কিস্তিতে ইজারার টাকা দেওয়ার নিয়ম। কিন্তু ২ কিস্তি দেওয়ার পর আর অর্থ শোধ করতে পারেনি সংশ্লিষ্ট ইজারাদার। তাদের বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে মামলাও করেছে পার্ক কর্তৃপক্ষ।
আমাদের সময়ের অনুসন্ধানে জানা গেছে, ইজারার অর্থ সময়মতো পরিশোধ করতে না পারায় ইজারা বাতিল করে কর্তৃপক্ষ। এরপর চলতি বছরের ১ জুন থেকে পার্ক কর্তৃপক্ষ নিজেরাই বিভিন্ন  স্থানের টিকিট বিক্রি করছে। কোর সাফারি গেটের প্রবেশ মূল্য ১০০ টাকা। মেইন গেটে প্রবেশ মূল্য ৫০ টাকা। পার্কিং ৬০ টাকা। এই তিনটি ইভেন্টের দায়িত্বে রয়েছে পার্ক কর্তৃপক্ষ। এসব স্থানে টিকিট বিক্রি করার কথা অফিস সহকারীর। কিন্তু তার বদলে টিকিট বিক্রিতে ব্যস্ত দেখা গেছে পার্কের ওয়াইল্ড লাইফ সুপারভাইজার আনিসুর রহমান ও পশু চিকিৎসক ডা. জুলকার নাইন মানিককে। ঈদ মৌসুমে প্রতিদিন গড়ে ১৫ হাজারের মতো দর্শনার্থী পার্ক পরিদর্শনে আসে বলে জানায় কর্তৃপক্ষ।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পার্কের দুই কর্মচারী আমাদের সময়কে বলেন, অবৈধভাবে টিকিট বিক্রি ছাড়াও কম টাকায় বিনা টিকিটে দর্শনার্থীদের ভেতরে ঢুকিয়ে বাড়তি অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছেন আনিসুর রহমান ও জুলকার নাইন। এক্ষেত্রে বড় দলে ঘুরতে আসা ব্যক্তিদের টার্গেট করে এই সুবিধা নেন তারা।
গত ২৪ জুলাই কোর সাফারি গেটের সামনে ১২ জন দর্শনার্থীর সঙ্গে দরদাম করতে দেখা যায় আনিসুর রহমানকে। পরে তাদের বিনা টিকিটে ভিআইপি সাজিয়ে ভেতরে প্রবেশ করানো হয়। হরহামেশাই এমন চিত্র দেখা যায়।
টিকিট জালিয়াতির বিষয়ে জানতে চাইলে ওয়াইল্ড লাইফ সুপারভাইজার আনিসুর রহমান আমাদের সময়কে বলেন, অনেক সময় সরকারি পদস্থ কর্মকর্তাসহ প্রভাবশালী লোকজন এসে বিনামূল্যে প্রবেশ করতে চায়। তখন আমাদের কিছু করার থাকে না। টিকিট জালিয়াতির বিষয়টি ঠিক না।
পার্কের প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্বে রয়েছেন তপন কুমার দে। পার্কের কয়েকজন কর্মী ও ইজারাদার অভিযোগ করেন, প্রকল্প পরিচালকের কয়েকজন স্বজন বিধিবহির্ভূতভাবে পার্কে কাজ করছেন। আর এগ ওয়ার্ল্ডের টিকিটের তত্ত্বাবধানে রয়েছেন পরিচালকের স্বজন মিহির রঞ্জন দে। আবেদন করলেও এগ ওয়ার্ল্ডের ইজারা তিনি পাননি বলে নিশ্চিত করে সংশ্লিষ্টরা। কিন্তু গত ৭ মাস ধরে এগ ওয়ার্ল্ড থেকে ৪ লাখ টাকারও বেশি অর্থ উপার্জন হলেও তার কোনো হদিস নেই। এছাড়া পাখি প্রদর্শনীর ইজারাও রয়েছে মিহির রঞ্জন দের হাতে।
এখানেই শেষ নয়, পার্কে বিভিন্ন স্থাপনা ভাঙা-গড়ার খেলায় বিপুল পরিমাণ সরকারি অর্থ লোপাট হচ্ছে। টেন্ডার ছাড়াই সব নির্মাণকাজ দেওয়া হয় স্থানীয় ছাত্রলীগ নেতা রফিকুল ইসলামকে। মোটা অঙ্কের টাকায় নির্মিত বাঘ-সিংহের বেষ্টনী বছর ঘুরতেই ভেঙে পড়ে। এতে অরক্ষিত হয়ে পড়ে প্রাণীদের জীবন। এমনকি আশপাশের জনপদের মানুষের জন্য তৈরি হচ্ছে হুমকি। গত ঈদুল ফিতরের দিনে একটি বাঘ বেষ্টনী থেকে বেরিয়ে পাশের এক বাড়িতে ঢুকে পড়ে। পরে সেখান থেকে বাঘটিকে উদ্ধার করে আনা হয়। একই কারণে কয়েকটি বিরল প্রজাতির শকুন উড়ে গেছে। এছাড়া চিকিৎকের অবহেলায় গত ২১ জুন একটি জিরাফ মারা যায় বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। জিরাফটির মূল্য প্রায় ৮০ লাখ টাকা ছিল বলে জানিয়েছে পার্ক কর্তৃপক্ষ। প্রাণীদের চিকিৎসা অভিজ্ঞ চিকিৎসকদের দিয়ে না করিয়ে কম্পাউন্ডারদের দিয়ে করানোর অভিযোগ পাওয়া গেছে।
পার্ক ঘুরে দেখা যায়, পাখি দেখার টিকিটের মূল্য ১০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ টাকা করে দেওয়া হয়েছে, যা কর্তৃপক্ষের ধারণায় নেই। এই বাড়তি টাকার কোনো হিসাবও নেই। এছাড়া নিয়মবহির্ভূতভাবে হাতির পিঠে চড়তে দর্শনার্থীদের কাছ থেকে নেওয়া হচ্ছে ৩০ টাকা করে।
তবে চিকিৎসক জুলকার নাইন মানিক আমাদের সময়কে বলেন, ‘আমি কেন টিকিট বিক্রি করব। আমার তো সেটা কাজ নয়। আর জিরাফের মৃত্যুতে চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগের বিষয়টি ঠিক নয়। জিরাফের মৃত্যুর পর বিশেষজ্ঞ দল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। বর্তমানে ওই প্রাণীর মৃত্যুর কারণ ক্ষতিয়ে দেখছে ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা।
জানা গেছে, ২০ লাখ টাকা ব্যয়ে পার্কের ভেতরের পাহাড় গেটটি নির্মাণের কিছুদিন পরই একাংশ ভেঙে পড়ে কয়েকজন দর্শনার্থী আহত হন। গত সোমবারও ওই গেটের একটি অংশ ভাঙা অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখা গেছে। এছাড়া কোটি টাকা মূল্যে নির্মিত পার্কের ‘প্রকৃতি বীক্ষণ কেন্দ্র’ এক বছরেও উদ্বোধন করা হয়নি। পার্ক সূত্র জানিয়েছে, কেন্দ্রটি সম্পূর্ণ ডিজিটালাইজ পদ্ধতিতে করা হয়েছে। কিন্তু উদ্বোধনের আগেই কেন্দ্রের অনেক যন্ত্রপাতি হাওয়া হয়ে গেছে।
এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে পার্কের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শিব প্রসাদ ভট্টাচার্য আমাদের সময়কে বলেন, বিষয়গুলো আমার জানা নেই। জেনে তারপর বলতে হবে।
ইজারা ছাড়া নিজের স্বজনকে এগ ওয়ার্ল্ড বরাদ্দ দেওয়ার বিষয়ে জানতে বেশ কয়েকবার প্রকল্প পরিচালক তপন কুমার দেকে তার মুঠোফোনে ফোন করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।
সময়মতো টাকা শোধ করতে ব্যর্থ হওয়া পার্কের মেইন গেটের ইজারাদার কবির হোসেন দাবি করেন, ‘আমার ইজারার সময় ছিল আগামী ৬ আগস্ট পর্যন্ত। কিন্তু তার আগেই জোর করে ইজারা বাতিল করা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে আমি উচ্চ আদালতের দারস্থ হয়েছি। কিন্তু পার্ক কর্তৃপক্ষ কোনো কথাই শুনছে না। প্রকল্প পরিচালক তপন কুমার তার ভাই, ভাতিজা, মামাসহ বেশ কয়েকজন স্বজনকে দিয়ে বিধিবহির্ভূতভাবে কাজ করাচ্ছেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।
সূত্র : দৈনিক আমাদের সময় 29/07/15

0 comments:

Post a Comment

Advertisement

 

Copyright 2008 All Rights Reserved Revolution Two Church theme by Brian Gardner Converted into Blogger Template by Bloganol dot com