দখল, দূষণ, লবণে বিপন্ন হালদা
উৎপত্তি আর সমাপ্তি—দুটিই দেশের ভেতর। বাংলাদেশে এমন বিরল বৈশিষ্ট্যের নদী মাত্র একটিই—হালদা। এ নদীকে বলা হয় পৃথিবীর একমাত্র জোয়ার-ভাটার নদী, যেখানে রুইজাতীয় মাছ ডিম ছাড়ে। প্রাকৃতিক মত্স্য প্রজননকেন্দ্র হিসেবেও নদীটি বিশ্বজুড়ে পরিচিত। কিন্তু জীববৈচিত্র্য আর মত্স্যসম্পদে ভরপুর হালদা নদীর প্রাণ আজ নিভু নিভু। দখল, দূষণ, লবণাক্ততা, রাবার ড্যাম নির্মাণসহ বিভিন্ন কারণে হালদা নদী এখন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। এ নদীর ওপর নির্ভরশীল প্রায় এক কোটি মানুষের জীবন-জীবিকাও হুমকির মুখে।
হালদাকে বাঁচাতে দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় পরিবেশবাদী সংগঠন ও বিশেষজ্ঞরা দাবি জানালেও এত দিন তাতে সাড়া দেয়নি কেউ।
তবে দেরিতে হলেও এবার সরকারের নীতিনির্ধারকদের টনক নড়েছে। অস্তিত্ব সংকটে থাকা হালদা নদীকে বাঁচাতে উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। নদীর উত্পত্তিস্থল খাগড়াছড়ির রামগড় থেকে শুরু করে কর্ণফুলী নদীর সংযোগস্থল পর্যন্ত ৮৬ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের নদীর উভয় পাড় থেকে ৫০০ মিটার প্রস্থের এলাকাকে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) হিসেবে ঘোষণা করবে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়। আগামী মার্চ অথবা এপ্রিলে আনুষ্ঠানিকভাবে এ ঘোষণা দেওয়া হবে।
হালদা নদীকে ইসিএ ঘোষণা করা হলে তা হবে দেশের ১৪ নম্বর। এর আগে হাকালুকি হাওর, সোনাদিয়া দ্বীপসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ১৩টি এলাকাকে ইসিএ ঘোষণা করেছিল সরকার।
পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, সরকারের একার পক্ষে হালদাকে বাঁচানো সম্ভব নয়। নদী রক্ষায় এগিয়ে আসতে হবে স্থানীয়দেরও। হালদা নদীকে ইসিএ ঘোষণা করার পর জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন ও গ্রাম পর্যায়ে সরকার কমিটি গঠন করে দেবে। ওই কমিটি নদী রক্ষায় কাজ করবে। নদী বাঁচাতে সবাইকে সচেতন করে তুলবে ওই কমিটি। হাকালুকি হাওর, টাঙ্গুয়ার হাওরসহ অন্যান্য ইসিএ এলাকায় এমন কমিটি গঠন করে সুফল পাওয়া গেছে।
হালদা নদীর প্রাকৃতিক প্রজননক্ষেত্র সংরক্ষণ ও রুইজাতীয় মাছের কৌলিতাত্ত্বিক বিশুদ্ধতা (জেনেটিক পিউরিটি) অক্ষুণ্ন রাখতে এরই মধ্যে একটি কমিটি করা হয়েছে। ১৯ সদস্যের কমিটির প্রধান করা হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব আবুল কালাম আজাদকে। ইসিএ ঘোষণার পর হালদা নদীর উত্পত্তিস্থল থেকে কর্ণফুলীর সংযোগস্থল পর্যন্ত এলাকায় সব ধরনের প্রতিবন্ধকতা দূর করে সেখানে মিঠা পানির প্রবাহ ও গতি বাড়াতে কার্যকর উদ্যোগ নেবে কমিটি। হালদা নদীর রুইজাতীয় মাছের প্রাকৃতিক প্রজননক্ষেত্র-সংলগ্ন খালগুলোতে পানির ধারণক্ষমতা বাড়াতে কর্মপন্থা ঠিক করে দেবে কমিটি। নদীতে লবণাক্ততা প্রবেশের ঝুঁকি কমাতেও সব ধরনের ব্যবস্থা নেবে তারা। হালদা নদীর মত্স্য প্রজননক্ষেত্র সংযুক্ত ১২টি খালের মুখে স্লুইস গেট, নদীর গড়দুয়ারা বাঁক পুনরুদ্ধারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া এবং প্রজননক্ষেত্রে মা মাছের অবাধ ও নিরাপদ বিচরণ নিশ্চিত করতে সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়ারও উদ্যোগ নেবে কমিটি।
পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক রইছউল আলম মণ্ডল কালের কণ্ঠকে বলেন, হালদার অবস্থা অত্যন্ত সংকটাপন্ন। শিল্প-কারখানার বর্জ্য থেকে সৃষ্ট দূষণের কারণে সেখানে কার্পজাতীয় মাছের (রুই, কাতল, মৃগেল ও কালিবাউশ) ডিম ছাড়ার হার কমে গেছে। নদীদূষণের কারণে চট্টগ্রামবাসীকে সুপেয় পানি সরবরাহ করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। নদীতে লবণাক্ততাও বাড়ছে আশঙ্কাজনক হারে। এসব কারণে হালদা নদীকে ইসিএ ঘোষণার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বলেন, নদী রক্ষায় কতটা প্রতিরোধ সৃষ্টি করা যায়, সেটিই বিবেচ্য বিষয়। কারণ, সেখানে সরকারের কৃষি মন্ত্রণালয়, মত্স্য, এলজিইডি, পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ অনেক সংস্থা কাজ করে। তাদের মধ্যে সমন্বয় করতে হবে।
বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ (সংশোধিত ২০১০)-এর ধারা-৫-এর উপধারা-১-এর মধ্যে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণার বিধান রাখা হয়েছে। ওই ধারায় বলা হয়েছে, ‘সরকার যদি এই মর্মে সন্তুষ্ট হয় যে, পরিবেশের অবক্ষয়ের কারণে কোনো এলাকার প্রতিবেশব্যবস্থা সংকটাপন্ন অবস্থায় উপনীত হইয়াছে বা হইবার আশঙ্কা রহিয়াছে তাহা হইলে সরকার, সরকারি গেজেটে প্রজ্ঞাপন দ্বারা উক্ত এলাকাকে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করিতে পারিবে এবং অবিলম্বে উক্ত সংকটাপন্ন অবস্থা হইতে উত্তরণের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করিবে।’
পরিবেশ অধিদপ্তরের সরেজমিন প্রতিবেদনে দেখা গেছে, হালদা নদীর উজান এলাকায় অপরিকল্পিতভাবে দুটি রাবার ড্যাম নির্মাণের কারণে পানির প্রবাহ অনেক কমে গেছে। এতে একদিকে যেমন নদীর পরিবেশ ও প্রতিবেশ বিঘ্নিত হচ্ছে, অন্যদিকে ভাটি এলাকায় পানির তীব্র অভাব দেখা দিচ্ছে। চট্টগ্রাম এলাকায় ইটভাটাসহ বিভিন্ন শিল্প-কারখানা থেকে নির্গত বর্জ্য গিয়ে পড়ায় নদীর পানি, মাটি ও বাতাস দূষিত হচ্ছে। মা মাছ দূষিত পানিতে ডিম ছাড়ছে না। আগে হালদা নদী থেকে প্রতিবছর এক হাজার কোটি টাকা জাতীয় অর্থনীতিতে যোগ হতো, এখন তাও কমে গেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হালদা নদী থেকে রুই-কাতলজাতীয় মা মাছ ধরা নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হলেও রাউজান, হাটহাজারী উপজেলায় নদীর তীরবর্তী এলাকায় অবৈধ মত্স্য শিকারিরা রাতে প্রতিনিয়ত মা মাছ শিকার করছে। স্থানীয় প্রভাবশালীরা হালদা নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করায় মা মাছের নিরাপদ চলাচলে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। হালদা ও এর শাখানদীতে রাবার ড্যাম নির্মাণ, বাঁধ ও স্লুইস গেট নির্মাণের কারণে নদীতে লবণাক্ত পানি বাড়ছে, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে মাছের ওপর।
প্রতিবেদন তৈরিতে জড়িত এক কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, হালদা নদী স্থানীয়ভাবে বিপন্ন প্রাণী ডলফিনের আবাসস্থল। কিন্তু পানিদূষণের কারণে ডলফিনের সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে কমেছে। হালদা নদী ঘিরে নিষিদ্ধ কর্মকাণ্ড বন্ধ করার উদ্দেশ্যেই একে ইসিএ ঘোষণার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সূত্র ঃ আরিফুর রহমান
, দৈনিক কালের কন্ঠ


0 comments:
Post a Comment