শিল্পদূষণেই চার নদীর সর্বনাশ
এক রকম মুখ থুবড়ে পড়েছে সরকারের নদী সুরক্ষাকেন্দ্রিক বিশেষ টাস্কফোর্সের সুপারিশ ও পরামর্শ। কোনো কিছুই নদীদূষণ বন্ধের জন্য দীর্ঘ মেয়াদে টেকসই হয়নি। আর এর জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী করা হয় ঢাকার শিল্প-কারখানাগুলোকে। যাদের সামলানোই মুশকিল হয়ে পড়েছে সরকারের পক্ষে।
শিল্পবর্জ্যে ভয়াবহ দূষণ বুড়িগঙ্গা নদীতে।
এবার তাই আগের যেকোনো পর্যায়ের চেয়ে শক্তিশালী উদ্যোগ নিয়ে গতকাল বুধবার একজোট হলো সরকারের প্রভাবশালী আট মন্ত্রণালয় আর ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন। যেখানে সশরীরে উপস্থিত ছিলেন ছয়জন মন্ত্রী ও দুজন মেয়রসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের শীর্ষ কর্তাব্যক্তিরা। তাঁরা বৈঠক করে সিদ্ধান্ত নিলেন ঢাকার চারপাশের নদীদূষণ রোধের জন্য দায়ী ও নিয়ম ভঙ্গকারী শিল্প-কারখানাগুলোকে বন্ধ করে দেওয়ার। একই সঙ্গে হাজারীবাগ থেকে যেসব ট্যানারি কারখানা সাভারে স্থানান্তর করবে না সেগুলোও প্রয়োজনে বন্ধ করে দেওয়া হবে। সেই সঙ্গে চার নদীর সমন্বিত সার্কুলার নৌপথ সচল করার জন্য পুনরায় কাজ শুরু হবে। বিশেষ করে বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা, বালু ও তুরাগের দূষণরোধে নতুন একটি প্রকল্প গ্রহণ করবে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়। প্রকল্প গ্রহণের পর ফিজিবিলিটি স্টাডি করার জন্য কনসালন্ট্যান্ট নিয়োগ করা হবে। সংশ্লিষ্ট অন্য মন্ত্রণালয় ও সংস্থাগুলো পরস্পর সহায়তা দেবে। বৈঠকে উপস্থিত মন্ত্রণালয় ও সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে এ কাজে নেতৃত্ব তুলে দেওয়া হয় নৌপরিবহনমন্ত্রীর ওপর।
গতকাল নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত এ বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন
নৌপরিবহনমন্ত্রী শাহজাহান খান। এ সময় আরো উপস্থিত ছিলেন এলজিআরডি মন্ত্রী খন্দকার
মোশাররফ হোসেন, গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন,
পানিসম্পদমন্ত্রী আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, পরিবেশ ও বনমন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু, ভূমিমন্ত্রী
শামসুর রহমান শরীফ, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আনিসুল হক এবং ঢাকা দক্ষিণ
সিটি করপোরেশনের মেয়র সাঈদ খোকন।
বৈঠকে তথ্য প্রকাশ করে বলা হয়, ঢাকার চারপাশের নদ-নদী দূষণের জন্য
প্রধানত দায়ী শিল্প-কারখানা ও ট্যানারি। এ ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৬০ শতাংশ বর্জ্য আসে
শিল্প-কারখানা থেকে, ৩০ শতাংশ আসে ট্যানারি থেকে, বাকিটা আবাসিক বর্জ্য। এ
ক্ষেত্রে শিল্প-কারখানাগুলোর জন্য নিজস্ব ইটিপি বা বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ইউনিট
স্থাপন বাধ্যতামূলক করা হলেও অনেকেই এখনো ইটিপি করেনি, আবার যারা করেছে তাদের
মধ্যে অনেকগুলোই তা চালু রাখে না। ফলে এতে খুব একটা সফলতা আসছে না। পাশাপাশি
ট্যানারি সরিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রেও ট্যানারি মালিকরা খামখেয়ালিপনা করছে। সরকার
সম্প্রতি সময় বেঁধে দিলেও আদালতের আশ্রয় নিয়ে এখনো আগের জায়গায়ই বহাল রয়েছে
ট্যানারিশিল্প। তবে ইটিপি থাকতেও তা চালু না রাখার দায়ে এ পর্যন্ত বিভিন্ন অভিযানে
১১৮ কোটি টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে বলেও বৈঠকে জানানো হয়।
বৈঠক শেষে কালের কণ্ঠ’র প্রশ্নের মুখে নৌপরিবহনমন্ত্রী শাহজাহান
খান বলেন, ‘এর আগে বুড়িগঙ্গা পরিষ্কারসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হলেও সে সময় সিটি
করপোরেশন থেকে প্রয়োজনীয় সহায়তা পাওয়া যায়নি। কারণ তখনকার মেয়র ছিলেন বিএনপির। আর
এখনকার দুই সিটি করপোরেশনের মেয়রই হচ্ছেন আওয়ামী লীগের। তাই তাঁদের কমিটমেন্ট আছে।
তাঁরা ইতিমধ্যে অনেক ভালো ভালো কাজ করে দেখিয়েছেন। ফলে এবার আমাদের এ উদ্যোগে
তাঁরাও অংশীদার হবেন এবং আমরা একযোগে নদীগুলোকে দূষণমুক্ত করব।’
শাহজাহান খান এ সময় বলেন, ‘ঢাকার চারপাশের নদীগুলো যেভাবে দূষণের
শিকার হয়েছে এবং হচ্ছে তাতে আমরা খুবই উদ্বিগ্ন। এর আগেও অনেক পদক্ষেপ নেওয়া
হয়েছিল টাস্কফোর্সের মাধ্যমে। এখন আরো বড় ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। আর
প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে আমরা নদীদূষণ রোধে এ বৈঠকে মিলিত হয়েছি।’
মন্ত্রী বলেন, সাভারে কেন্দ্রীয় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কেন্দ্র স্থাপন
করা হলেও তা এখন চালু করা যাচ্ছে না বর্জ্যের অভাবে। কারণ সেখানে ট্যানারি যাচ্ছে
না। অথচ এই ট্যানারি ঢাকার নদী ও পরিবেশকে বিষিয়ে তুলছে। তাই শিগগিরই সর্বশেষ
সুনির্দিষ্ট সময় দিয়ে হাজারিবাগের ট্যানারি কারখানা স্থানান্তরে শিল্প মন্ত্রণালয়
ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ট্যানারি স্থানান্তর করা না হলে
সেগুলো বন্ধ করে দেওয়া হবে। এ ছাড়া যেসব শিল্প-কারখানায় ইটিপি আছে, তা চালু না
রাখলে শুধু জরিমানা নয়, সেগুলো বন্ধ করে দেওয়া হবে। যেসব প্রতিষ্ঠানে ইটিপি স্থাপন
করা হয়নি, সেগুলোতে সুনির্দিষ্ট সময় দিয়ে তা স্থাপনে বাধ্য করা হবে—অন্যথায়
কারখানা বন্ধ করে দেওয়া হবে।
এদিকে বৈঠকে উপস্থিত গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ
হোসেন ঢাকার চারদিকের বৃত্তাকার নৌপথ চালুর বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে এ ক্ষেত্রে
বেশ কয়েকটি সেতুকে বাধা হিসেবে চিহ্নিত করে একাধিক কর্মকর্তা আলোচনা করেন। এ সময়
এলজিআরডি মন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেন বৈঠকে জানান, সার্কুলার নৌপথ চালুর
কার্যক্রম বাস্তবায়নের কাজ শুরু হলে সেতুর বাধা সমাধান করা হবে।
পানিসম্পদমন্ত্রী বৈঠকে জানান, তাঁর মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে যমুনা
থেকে পানি এনে বুড়িগঙ্গা নদীর পানিপ্রবাহ বাড়ানোর একটি প্রকল্প আছে, যা
বাস্তবায়নের বিষয়ে পরিকল্পনা চলছে।
বৈঠকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আনিসুল হক বলেন, “আমরা
ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনই ইতিমধ্যে জাতীয় পরিবেশ কমিটির সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে কাজ
শুরু করেছি। অনেক কাজ এগিয়ে গেছে। এ ক্ষেত্রে ‘ইকো রেস্ট্ররেশন অব রিভারস
অ্যারাউন্ড ঢাকা সিটি’ নামে একটি মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন চলছে। বিশেষ করে ২২০
কিলোমিটার দীর্ঘ নদীর তীরবর্তী কঠিন বর্জ্য অপসারণে ক্রাস প্রোগ্রাম নেওয়া হয়েছে।
এর আওতায় সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন স্থাপনের কাজও চলছে।”
কালের কণ্ঠ’র প্রশ্নের জবাবে মেয়র আনিসুল হক বলেন, ‘বাসাবাড়ির
বর্জ্য অপসারণে ইতিমধ্যে পরিকল্পিতভাবে কাজ শুরু হয়েছে। হাসপাতালগুলোর বর্জ্য
ব্যবস্থাপনাও একটি শৃঙ্খলার মধ্যে এসেছে। এখন শিল্প-কারখানাগুলোকে আরো কার্যকর
অবস্থায় নিয়ে আসতে হবে। কিন্তু দৃশ্যত সব কিছুই সিটি করপোরেশনের আওতায় বলে মনে
হলেও বাস্তবে অনেক কিছুই আমার আওতায় না। তবু আমাকে যদি আমার এলাকার মধ্যে অন্যান্য
সংস্থার মালিকানায় থাকা নদী-খাল-লেক বা ড্রেনেজ ব্যবস্থা রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব
হস্তান্তর করা হয়, তাহলে আমি তা নিতে রাজি আছি।’
বৈঠকে ঢাকা ওয়াসার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তাদের পাগলায় একটিমাত্র
ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট রয়েছে। এখন আরো পাঁচটি এমন প্লান্ট চালুর কাজ চলছে। এ
ছাড়া ঢাকার মধ্য থাকা খালগুলোও পুনরুদ্ধারের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
জানতে চাইলে পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের চেয়ারম্যান আবু নাসের খান
কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা যতটুকু জানি, প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে যখনই নদীদূষণ বা
দখল বন্ধে তাগিদ দেওয়া হয় তখনই সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থাগুলো তৎপর হয়ে ওঠে।
বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়। কিন্তু কিছু দূর এগিয়েই তা আবার ঝিমিয়ে পড়ে। ফলে এ ক্ষেত্রে
কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় অগ্রগতি মিলছে না। তবে গত কয়েক বছরে যতটুকু অর্জন হয়েছে তাও কম
নয়। এখন কেবল সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থাগুলোকে ঝিমিয়ে না পড়ে একটানা কাজ
চালিয়ে যেতে হবে।’
এদিকে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, দেশের নদ-নদী রক্ষায় উচ্চ
আদালত থেকে সরকারের প্রতি নির্দেশনা প্রদানের পর ২০০৯ সালের ২৪ আগস্ট
মন্ত্রিপরিষদের সভায় ‘দেশের গুরুত্বপূর্ণ নদ-নদীর নাব্যতা এবং নদীর স্বাভাবিক
গতিপ্রবাহ অব্যাহত রাখার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের বিষয়ে পরামর্শ প্রদান,
সুপারিশ প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের জন্য গঠিত টাস্কফোর্স’ শিরোনামে একটি জাতীয়
টাস্কফোর্স গঠন করা হয়, যা ওই বছরই ২৭ আগস্ট গেজেট আকারে প্রকাশ পায়। এর সভাপতি
করা হয় নৌপরিবহনমন্ত্রী শাহজাহান খানকে। কমিটির সদস্য তালিকায় আছেন আইনমন্ত্রী,
পানিসম্পদমন্ত্রী, ভূমিমন্ত্রী, বন ও পরিবেশ প্রতিমন্ত্রী, ঢাকার মেয়র, ঢাকার
চারপাশের নদ-নদীসংশ্লিষ্ট এলাকার ১১ জন সংসদ সদস্য, অ্যাটর্নি জেনারেল, ১০ জন
সচিব, ভূমি জরিপ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, বিআইডাব্লিউটিএর চেয়ারম্যান, তিনজন
সাংবাদিক, পাঁচজন পানি, নদী ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ এবং পাঁচজন জেলা প্রশাসক। এ
ছাড়া প্রয়োজনমতো আরো সদস্য অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগ আছে। ফলে এখন পর্যন্ত
সদস্যসংখ্যা ৪০ জন ছাড়িয়ে গেছে।



0 comments:
Post a Comment