বস্তায় বস্তায় ঋণের টাকা লোপাট(বেসিক ব্যাঙ্কে)
সাড়ে চার হাজার কোটি নয়, বেসিক ব্যাংক থেকে লোপাট হয়েছে সাড়ে আট হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে কাজের বুয়াদের নামে ঋণ মঞ্জুর হয়েছে দুই হাজার কোটি টাকা। ঋণ দেয়া হয়েছে বাড়ির দারোয়ান, ড্রাইভার, কর্মচারীর নামে চলা প্রতিষ্ঠানকে। সাড়ে সাত বছরের শিশুকন্যার নামে মঞ্জুর হয়েছে তিন কোটি টাকা। সুদে-আসলে যা এখন দাঁড়িয়েছে আট কোটি টাকার ওপরে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ইন্টেলিজেন্স ইউনিট এবং আইনশৃংখলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে বস্তায় বস্তায় টাকা সরিয়ে নেয় বেসিক ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল হাই বাচ্চুর লোকেরা। বড় পেমেন্টগুলোর ক্ষেত্রে পে-অর্ডার কিংবা চেকের মতো প্রমাণও রাখা হয়নি। চাঞ্চল্যকর এমন বহু তথ্য বেরিয়ে এসেছে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধানে। তবে বেসিক ব্যাংকের অবিশ্বাস্য লোপাটের ঘটনা অনুসন্ধানের সফল পরিসমাপ্তি বেঁধে দেয়া কোনো সময়সীমার মাধ্যমে সম্পাদন সম্ভব নয় বলে জানিয়েছে দুদকের উচ্চপর্যায়ের সূত্র। ঘটনার ভয়াবহতা নিরূপণ, সত্য তথ্য উদ্ঘাটনে বিদ্যমান অনুসন্ধান টিমকে শক্তিশালী করা হতে পারে বলেও জানায় সূত্র। সদস্য সংখ্যা বাড়িয়ে যুক্ত করা হতে পারে ব্যাংকিং ফ্রডের ওপর দক্ষ ও অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের।
দুদক সূত্র জানায়, বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ২০১৩ সালে দুদক বেসিক ব্যাংকের সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা লোপাটের ঘটনা অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেয়। প্রথমে উপপরিচালক মুহা. মাহবুবুল আলমকে বিষয়টি অনুসন্ধানের দায়িত্ব দেয়া হলেও ঘটনার স্পর্শকাতরতা ও ব্যাপকতার কারণে উপপরিচালক মীর মো. জয়নুল আবেদীন শিবলীর নেতৃত্বে একটি টিম গঠন করা হয়। টিমের কয়েকজন কর্মকর্তা বদলি এবং হলমার্ক কেলেংকারিসহ গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি অনুসন্ধানে যুক্ত হলে উপপরিচালক সৈয়দ ইকবাল হোসেনের নেতৃত্বে টিম পুনর্গঠন করা হয়। উপপরিচালক মাহবুবুল আলম, সহকারী পরিচালক আশিকুর রহমান এ টিমের সদস্য। এ টিম দুই বছর ধরে বেসিক ব্যাংকের অর্থ হরিলুট নিয়ে কাজ করছে। মাঝে অনুসন্ধান অনেকটা স্থবির হয়ে পড়লেও এ বিষয়ে সম্প্রতি অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বেসিক ব্যাংকে ‘হরিলুটের’ পেছনে আবদুল হাই বাচ্চু জড়িত’ উল্লেখ করে তার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা গ্রহণের কথা উল্লেখ করে বক্তব্য দেন। জাতীয় সংসদেও এ নিয়ে আলোচনা হয়। এর পরপরই দুদক সক্রিয় হয়ে ওঠে বেসিক ব্যাংকের অনুসন্ধান বিষয়ে। ২৮ জুলাইয়ের মধ্যে অনুসন্ধান বিষয়ে একটি প্রতিবেদন জমা পড়ার কথা থাকলেও পরে কমিশন বড় এ ঘটনায় তড়িঘড়ি অনুসন্ধান নিষ্পন্ন না করার বিষয়ে একমত হয়। কারণ সুষ্ঠু অনুসন্ধানের স্বার্থে বেসিক ব্যাংকের আরও রেকর্ডপত্র হস্তগত করা প্রয়োজন। জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন সে সময় দায়িত্বশীল পদে থাকা কর্মকর্তা এবং ঋণগ্রহীতা প্রতিষ্ঠান মালিকদের। এ বাস্তবতায় নিদেনপক্ষে একটি ‘অগ্রগতি প্রতিবেদন’ দাখিল করতে আরও অন্তত ১৫ কার্যদিবস লেগে যেতে পারে বলে জানিয়েছে দুদকের উচ্চপর্যায়ের সূত্রটি।
এদিকে বেসিক ব্যাংক নিয়ে পূর্ণ উদ্যোমে শুরু হওয়া অনুসন্ধান সম্পর্কে আপাতত বিস্তারিত কোনো মন্তব্য করতে রাজি হচ্ছেন না দুদকের শীর্ষ কর্মকর্তারা। তবে ঘটনার নেপথ্য নায়ক বেসিক ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান শেখ আবদুল হাই বাচ্চুর সংশ্লিষ্টতা প্রমাণে আরও কিছু রেকর্ড হাতে নেয়ার চেষ্টা করছে দুদক টিম। এ প্রক্রিয়ায় বাচ্চুর সময়কালে নিয়োগ, বদলি, পদোন্নতি, ক্ষমতা কুক্ষিগতকরণ সংক্রান্ত বোর্ড রেজুলেশনসহ রেকর্ডপত্র চেয়ে ব্যাংকটির বর্তমান ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষকে চিঠি দেয়া হবে বলে জানা গেছে।
সূত্র জানায়, বেসিক ব্যাংকের নজিরবিহীন হরিলুট অনুসন্ধানে নেমে বিস্মিত দুদক কর্মকর্তারাই। যে প্রক্রিয়ায় সোনালী ব্যাংক থেকে হলমার্ক অর্থ হাতিয়ে নিয়েছে- বেসিক ব্যাংকের প্রক্রিয়াটি ছিল ঠিক বিপরীত। হলমার্কের জালিয়াতি সীমাবদ্ধ ছিল ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর থেকে তার অধস্তন কর্মকর্তাদের মাঝে। হলমার্ক গ্র“প কোনো ভুয়া প্রতিষ্ঠানের বিপরীতে ঋণ সুবিধা নেয়নি। ভুয়া এলসির বিপরীতে অর্থ সরিয়েছে। এ বিষয়ে প্রায় ১৩ হাজার রেকর্ডপত্র দুদকের অনুসন্ধানের সহায়ক ছিল। হলমার্ক কেলেংকারিতে ব্যাংকের শীর্ষ ব্যক্তিদের নজরদারির দায়িত্বহীনতা প্রমাণিত হলেও সরাসরি সংশ্লিষ্টতা পায়নি দুদক।
পক্ষান্তরে বেসিক ব্যাংকের হরিলুট হয়েছে শীর্ষ পর্যায় থেকে, বিপরীত পদ্ধতিতে। এখানে লুট হয়েছে অধিকাংশই ডকুমেন্ট ছাড়া। ঋণের নামে লুণ্ঠন হয়েছে তৎকালীন চেয়ারম্যান শেখ আবদুল হাই বাচ্চুর পরিকল্পনা ও নির্দেশনায়। বেসিক ব্যাংকের সর্বেসর্বা ছিলেন তিনি। পরিচালনা পর্ষদ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টরসহ সংশ্লিষ্টদের নানাভাবে নিয়ন্ত্রণের শৃংখলে বেঁধে রাখেন।
সূত্রটি জানায়, বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্কুলার অনুযায়ী, ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর পর্যন্ত কর্মকর্তাদের পদোন্নতি ও বদলির এখতিয়ার ব্যবস্থাপনা পরিচালকের। কিন্তু বোর্ড রেজুলেশনে এমডির এখতিয়ার নিয়ে নেন চেয়ারম্যান বাচ্চু। ফলে তার উদ্দেশ্য চারিতার্থে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেন- এমন কর্মকর্তাদের তিনি সরিয়ে দেন। পদোন্নতি দিয়ে, সুবিধাদি বাড়িয়ে তাদের স্থলাভিষিক্ত করেন তার বিশ্বস্ত, অনুগত, সহায়ক ও সুবিধাভোগীদের। চাকরিচ্যুতি, বিভাগীয় মামলা, পদোন্নতি, বদলির মতো হাতিয়ার ব্যবহার করে পুরো ব্যাংকে প্রতিষ্ঠা করেন একক নিয়ন্ত্রণ।
অনুসন্ধান সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা জানান, বেসিক ব্যাংক হরিলুটের ঘটনায় যে মামলার প্রস্তুতি চলছে তাতে শেখ আবদুল হাই বাচ্চুর সংশ্লিষ্টতা প্রমাণে খুব বেশি তথ্য-প্রমাণের প্রয়োজন নেই। কারণ যে কোনো ঋণের আবেদন বিভিন্ন টেবিলের প্রক্রিয়া শেষে ক্রেডিট বোর্ডে ওঠে শাখা ব্যবস্থাপকের প্রস্তাবনার ভিত্তিতে। কিন্তু শেখ আবদুল হাই বাচ্চু ৩২টি ঋণ মঞ্জুর করেন শাখার কোনো প্রকার প্রস্তাবনা ছাড়াই। ঋণের জন্য দরখাস্তও জমা পড়েনি। অথচ ঋণ মঞ্জুর হয়ে গেছে ‘বোর্ড সভায়’। সভায় ঋণ প্রস্তাবের কোনো মাইনুটসও নেই। ৩২টি ঋণের মধ্যে এমনও রয়েছে, ৩০ জুলাই বোর্ডে ঋণ মঞ্জুর হয়ে গেছে। কিন্তু যে প্রতিষ্ঠানের নামে ঋণ মঞ্জুর হয়েছে সে প্রতিষ্ঠান লোন-অ্যাকাউন্ট খুলেছে ঋণ মঞ্জুরেরও এক সপ্তাহ পর। অস্তিত্বহীন জমির ভুয়া দলিল তৈরি করে সেটির অবিশ্বাস্য মূল্য দেখিয়ে ‘কো-লেটারাল’ রাখা হয়েছে। জমির মালিক জানেন না অথচ তার জমি বেসিক ব্যাংকের ‘বন্ধকী সম্পত্তি’ হয়ে গেছে ‘থার্ড পার্টি’ হিসেবে।
দুদক কর্মকর্তা আরও জানান, জামালপুর সদর ও বিভিন্ন মৌজার শত শত জমি ‘বন্ধক’ দেখানো হয়েছে বেসিক ব্যাংকে। জামালপুরের একটি পুকুরের স্থানীয় বাজারমূল্য প্রায় ২৫ হাজার টাকা। বেসিক ব্যাংক সেটিকে ৫ কোটি টাকা মূল্য ধরে ঋণ দিয়েছে। এভাবে গুলশান শাখা থেকে অন্তত এক ডজন শিপিং কোম্পানিকে ৩শ’ কোটি টাকা ঋণ দেয়া হয়েছে যার সবই ভুয়া। এসএফজি শিপিং লাইন, এস রিসোর্স শিপিং লাইন, এস সুহী শিপিং লাইন, শিফান শিপিং লাইন, এশিয়ান শিপিং লাইন, ল্যাবস এন্টারপ্রাইজ, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি, ডেল্টা সিস্টেমস লি., ব্রাদার্স এন্টারপ্রাইজ, গ্রিন বাংলা হোল্ডিং, কিয়েব ট্রেডিং এবং এম নাছির উদ্দিন বাসগৃহ প্রপার্টিজের মতো প্রতিষ্ঠান ঋণের অর্থ কোনোদিন ফেরত দিতে পারবে না।
ঋণের নামে ৫১৪ কোটি টাকা দেয়া হয়েছে ১৩ ব্যক্তিকে। ব্যাংকের সহায়তায় দুদকের ৬ মাস লেগেছে শুধু এসব প্রতিষ্ঠানের মালিকদের অস্তিত্ব সম্পর্কে নিশ্চিত হতে। কথিত এসব প্রতিষ্ঠান মালিকদের অর্থ প্রদানে কোনো প্রচলিত পদ্ধতি অবলম্বন করা হয়নি। মঞ্জুরকৃত ঋণের অর্থ আবেদনকারী প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে চেকের মাধ্যমে দেয়ার নিয়ম হলেও আবদুল হাই বাচ্চুর মৌখিক নির্দেশে তাদের টাকা দেয়া হয় নগদ, বস্তায় ভরে। ব্যক্তিগত ও বেসরকারি নিরাপত্তা ব্যবস্থায় টাকার বস্তার ট্রাক রাজধানী অতিক্রম করেছে রাতের অন্ধকারে। আবদুল হাই বাচ্চুর লোকেরাই এ অর্থ বহন ও ভাগ-ভাটোয়ারা করেন। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে শত শত কোটি টাকা ‘ঋণ মঞ্জুর’ করা হলেও এসব প্রতিষ্ঠান ছিল বাচ্চুরই প্রতিষ্ঠান। ভাই, ভাগ্নে, ভগ্নিপতি, আত্মীয়স্বজন এবং নিকট সম্পর্কীয় ব্যক্তিদের দিয়ে বাচ্চু অর্থ সরান।
নাম প্রকাশে আপত্তি জানিয়ে ওই দুদক কর্মকর্তা জানান, অনুসন্ধান শুরুর পর অন্তত ৩০ জন কথিত ‘ঋণগ্রহীতা’ ব্যক্তিগতভাবে যোগাযোগ করেছেন। তারা তাকে জানিয়েছেন, তার নামে প্রতিষ্ঠান খুলে ঋণ নেয়া হয়েছে এটি তিনি জানতেন না। কোনো কোনো ঋণগ্রহীতা জানিয়েছেন, তার প্রতিষ্ঠানের নামে হয়তো ঋণ মঞ্জুর করা হয়েছে ৩৫ কোটি টাকা। কিন্তু তিনি বুঝে পেয়েছেন ১৫ কোটি টাকা। এখন তাকে নিতে হচ্ছে ২০ কোটি টাকার ঋণের দায়। অথচ খেলাপি হিসেবে সব সম্পত্তি নিলামে ওঠালেও ২ কোটি টাকার মূল্য উঠবে না।
দুদক কর্মকর্তা জানান, বাসার কাজের বুয়ার নামে প্রতিষ্ঠান দেখিয়ে তার বিপরীতে লোন নিয়েছেন- এমন ঘটনা রয়েছে অন্তত ৫০টি। সাড়ে ৭ বছরের কন্যাশিশুকে প্রতিষ্ঠানের মালিক বানিয়ে বিপরীতে দেয়া হয়েছে সাড়ে তিন কোটি টাকা। যা এখন সুদে-আসলে বেড়ে কয়েক গুণ হয়েছে। ব্যক্তিগত গাড়ির ড্রাইভার, অফিসের কর্মচারী, নিরাপত্তাকর্মীর নামে খোলা প্রতিষ্ঠানের বিপরীতে ঋণ দেয়া হয়েছে দুই হাজার কোটি টাকা। এভাবে বেসিক ব্যাংকে টানা ৩ বছর ধরে ঋণের আওতায় লোপাট হয়েছে সাড়ে আট হাজার কোটি টাকা। যা সাবেক চেয়ারম্যান শেখ আবদুল হাই বাচ্চু এবং অধীনস্থ ৬ থেকে ১০ কর্মকর্তার সরাসরি তত্ত্বাবধানে সংঘটিত হয়েছে। তবে লোপাট হয়ে যাওয়া অর্থের অংক, বিভিন্ন পর্যায়ে অর্থের সুবিধাভোগী এবং সংশ্লিষ্টতা মিলিয়ে ব্যক্তির সংখ্যা শত শত। দুদকের অনুসন্ধানে লুণ্ঠন প্রক্রিয়া রূপকল্প পরিষ্কার হয়ে উঠলেও একটিমাত্র প্রতিবেদনেই সামগ্রিক চিত্র তুলে আনা সম্ভব নয় বলে জানান দুদকের ওই কর্মকর্তা। তাই প্রথম দফায় ৫০টি পৃথক ঘটনায় ৬০টি মামলার বিষয়বস্তু সুনির্দিষ্টকরণের কাজ চলছে। অনুসন্ধানের বিস্তৃতি বাড়লে বাড়বে মামলা ও আসামির সংখ্যা। প্রায় সব মামলায় আবদুল হাই বাচ্চু এবং তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাজী ফখরুল ইসলামকে আসামি করার উপকরণ রয়েছে বলে জানান তিনি।
বেসিক ব্যাংকের অনুসন্ধান সম্পর্কে জানতে চাইলে দুদক কমিশনার (অনুসন্ধান) ড. নাসির উদ্দীন আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, এটি (বেসিক ব্যাংক বিষয় অনুসন্ধান) সম্ভবত আরও সময় নেবে। কার কী সংশ্লিষ্টতা এটি দালিলিকভাবে সুনির্দিষ্ট করতে হবে। অপরাধের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একজনকেও ছাড় দেয়ার প্রশ্ন অমূলক।
সূত্র ঃ দৈনিক যুগান্তর ০২ আগস্ট, ২০১৫

0 comments:
Post a Comment