Thursday, August 6, 2015

ওয়াসার এমডি তাকসিম এর সীমাহিন দূর্নিতি



পদ্মা জশলদিয়া পানি শোধনাগার প্রকল্প

নিম্নমানের পাইপ এনে ফেঁসে যাচ্ছেন ওয়াসার এমডি তাকসিম



মুন্সীগঞ্জের পদ্মা (জশলদিয়া) পানি শোধনাগার প্রকল্পের জন্য আনা পাইপকে নিম্নমানের এবং টেকসই নয় বলে মতামত দিয়েছে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)। এই প্রকল্পে ব্যবহারের জন্য চীন থেকে আনা হয়েছে কে-৯ ক্লাস ডিআই পাইপ; কিন্তু বুয়েট বলেছে, এই প্রকল্পের জন্য কে-১০ ক্লাস ডিআই পাইপ উপযুক্ত। প্রাথমিক নমুনা যাচাই-বাছাই ও পরীক্ষার পর বুয়েটের ধাতব ও প্রকৌশল বিভাগের সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীরা এমন লিখিত মতামত দিয়েছেন দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক)।

তবে সরেজমিনে গিয়ে এই প্রকল্পের জন্য আনা পাইপ বিশদ পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে আরো বিস্তারিত জানা যাবে বলে বুয়েটের মতামতে বলা হয়েছে। আর এই পরীক্ষার জন্য প্রয়োজন পড়বে ৮৬ লাখ টাকা। এই টাকা পানি শোধনাগার প্রকল্প খাত থেকে বুয়েটের সংশ্লিষ্ট তহবিলে জমা দেওয়ার জন্য বলেছে বুয়েটের ধাতব ও প্রকৌশল বিভাগ। গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে দুদকের অনুসন্ধান-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
বুয়েট থেকে এমন মতামত পাওয়ার পরপরই দুদকের অনুসন্ধান কর্মকর্তা ও সহকারী পরিচালক শেখ আব্দুস সালাম এলজিআরডি মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) তাকসিম এ খানকে একটি চিঠি দেন। সেই চিঠিতে বলা হয়, সরেজমিনে গিয়ে পাইপ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার জন্য ব্যয় বাবদ ৮৬ লাখ টাকা প্রকল্প খাত থেকে যেন বুয়েটের তহবিলে দেওয়া হয়। ওই টাকা পেলেই বুয়েটের প্রকৌশলীরা প্রকল্প এলাকায় পরিদর্শনে যাবেন। ওই চিঠি পাওয়ার পর ওয়াসা কর্তৃপক্ষ বুয়েটকে ওই টাকা দিতে রাজি হয়েছে।
বুয়েটের প্রকৌশলীদের বরাত দিয়ে দুদকের একজন কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, পানি শোধনাগার প্রকল্পটিতে যে ধরনের পাইপ স্থাপন করা হচ্ছে, সেটা খুবই নিম্নমানের এবং বেশি দিন টেকসই হবে না। প্রায় চার হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের বিশাল একটি প্রকল্পে এমন নিম্নমানের পাইপ স্থাপন করা মানেই সরকারের বড় ধরনের বিপদ ডেকে আনা। তিনি আরো বলেন, নিম্নমানের এই পাইপ দিয়ে কাজ সম্পন্ন হলে প্রকল্পটি হুমকির মধ্যে থাকবে, পাশাপাশি সরকারের অনেক টাকার ক্ষতিসাধন হবে বলে আশঙ্কা করেন প্রকৌশলীরা।
এর আগে পদ্মা (জশলদিয়া) পানি শোধনাগার প্রকল্পের জন্য আর পাইপ আমদানি না করতে ওয়াসার এমডি তাকসিম এ খানকে চিঠির মাধ্যমে জানিয়ে দেয় দুদক। নিম্নমানের পাইপ আমদানি করা হলে বিপুল পরিমাণ সরকারি অর্থের ক্ষতি হতে পারে- এমন আশঙ্কা করে দুদক তাসকিম বরাবর চিঠি দেয়।
দুদক ও ওয়াসার কর্মকর্তারা জানান, রাজধানীবাসীর বিশুদ্ধ পানির চাহিদা মেটাতেই প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে মুন্সীগঞ্জের পদ্মা (জশলদিয়া) পানি শোধনাগারটি নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। আর এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে দুর্নীতির মাধ্যমে লাভবান হতে গিয়ে ওয়াসার এমডি এবার নিজেই ফেঁসে যাচ্ছেন। এলজিআরডি মন্ত্রী থেকে শুরু করে অনেকেই তাঁর ওপর ক্ষুব্ধ। এই প্রকল্পে দুর্নীতির কারণে এবার আর তিনি রেহাই পাবেন না বলে মনে হচ্ছে।
অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্প এলাকায় জমি অধিগ্রহণ এবং পরামর্শক নিয়োগের আগেই তড়িঘড়ি করে নিম্নমানের পাইপ আমদানি করেন ওয়াসার এমডি তাকসিম এ খান। অসৎ উদ্দেশ্যে প্রকল্প অনুমোদনের ১৩ মাস আগেই তিনি ঢাকা ওয়াসার ঠিকাদারের সঙ্গে চুক্তি সই করেন। ওই কাজের জন্য কোনো দরপত্র চাওয়া হয়নি, এমনকি ভেটিং (দরকষাকষি) হয়নি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে। এর ফলে সরকার ৫০০ কোটি টাকার ক্ষতির শিকার হবে।
দুদকে আসা অভিযোগে আরো বলা হয়েছে, ভেটিংয়ের সুযোগ থাকলেও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তা না করায় কমপক্ষে ৩৫০ কোটি টাকার ক্ষতি হবে। আর জমি অধিগ্রহণের আগেই বিদেশ থেকে নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী (পাইপ) আমদানির জন্য ব্যয় হয়ে যাওয়া টাকার ওপর অতিরিক্ত সুদ গুনতে হবে প্রায় দেড় শ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে সরকারের বড় অঙ্কের আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি কাজের মান নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
পদ্মা (জশলদিয়া) পানি শোধনাগার প্রকল্পের সঙ্গে জড়িত ওয়াসার একজন কর্মকর্তা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, 'এ প্রকল্পে ওয়াসার এমডির দুর্নীতি ও অনিয়মের কারণে পানি সরবরাহ প্রকল্পে ৫২৩ কোটি টাকার জন্য উন্নয়ন সহযোগী কোনো প্রতিষ্ঠান পাওয়া যাচ্ছে না। বিশ্বব্যাংক, এডিবি, জাইকাসহ বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করেও কোনো আশার আলো দেখা যাচ্ছে না। ফলে পুরো প্রকল্পটিই এখন হুমকির মুখে পড়েছে।
প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা ওয়াসার পদ্মা (জশলদিয়া) পানি শোধনাগার প্রকল্পের (ফেজ-১) ব্যয় নির্ধারণ করা হয় তিন হাজার ৫০৮ কোটি ৭৯ লাখ ১৫ হাজার টাকা। এর মধ্যে দুই হাজার ৪২ কোটি ৩৬ লাখ টাকা ঋণ হিসেবে দেবে চায়না এক্সিম ব্যাংক। বাকি অর্থ দেবে বাংলাদেশ সরকার ও ঢাকা ওয়াসা। সরকার ২০১৩ সালের ৮ অক্টোবর একনেকের বৈঠকে এ-সংক্রান্ত প্রকল্প অনুমোদন দেয়। পদ্মার জশলদিয়া পয়েন্টে এই শোধনাগার স্থাপন করা হবে। এখান থেকে পরিশোধিত পানি কেরানীগঞ্জ পর্যন্ত পৌঁছে দেওয়ার জন্য বসানো হবে পাইপ। বুড়িগঙ্গা নদীর তলদেশ দিয়ে এই পাইপ নেওয়া হবে। এ জন্য জশলদিয়া পয়েন্ট এবং কেরানীগঞ্জ পর্যন্ত পাইপ বসানোর জন্য জমি প্রয়োজন হবে। এই জমি অধিগ্রহণের কাজ শুরু করেছে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
সূত্র জানায়, ঋণের শর্তানুযায়ী প্রকল্পের মাঝামাঝি সময়ে চীন থেকে পাইপ কেনার কথা। কিন্তু ঢাকা ওয়াসা ঋণের শর্ত উপেক্ষা করে জমি অধিগ্রহণের চার মাস আগেই চীন থেকে পাইপ নিয়ে এসেছে। কাজ শুরু করার আগেই চীনা ব্যাংকের টাকায় পাইপ কেনায় সুদ গোনা শুরু হয়ে গেছে। অথচ ওয়াসার অধিগ্রহণ করা জমি বুঝে নিয়ে কনসালট্যান্ট নিয়োগ শেষে কাজ শুরু করতে কমপক্ষে এক বছর সময় দরকার। প্রকল্পের প্রাথমিক কাজ শুরুর পর পাইপ আনার সুযোগ ছিল। কিন্তু আগেভাগে পাইপ আমদানির জন্য চায়না এক্সিম ব্যাংককে অতিরিক্ত দেড় শ কোটি টাকা সুদ দিতে হবে।
- See more at: http://www.kalerkantho.com/print-edition/first-page/2015/08/07/253485#sthash.swx9TWqH.dpuf

0 comments:

Post a Comment

Advertisement

 

Copyright 2008 All Rights Reserved Revolution Two Church theme by Brian Gardner Converted into Blogger Template by Bloganol dot com