প্রভাবশালীরা গিলে খাচ্ছে শীতলক্ষ্যা নদী
এ হাই মিলন, রূপগঞ্জ থেকে | প্রকাশ : ১২ অক্টোবর ২০১৫রাজধানীর পাশের শীতলক্ষ্যা নদী দখল করে আছে শত শত প্রতিষ্ঠান ও রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তি। নদী দখল করে শিল্পপ্রতিষ্ঠানসহ নানা ধরনের স্থাপনা গড়ে তোলা হয়েছে। শীতলক্ষ্যা নদীর শুধু রূপগঞ্জ অংশেই ৩ শতাধিক পয়েন্টে ছোট-বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান, ইট-বালুর ব্যবসায়ী দখলদারিত্বের রাজত্ব কায়েম করেছে। হাইকোর্টের নিষেদ্ধাজ্ঞা সত্ত্বেও স্থানীয় প্রশাসন নদী দখল বন্ধে জোরালো উদ্যোগ নিচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে। ফলে দিন দিন দখলদারের সংখ্যা বাড়ছে। রূপগঞ্জে দখলের প্রতিযোগিতায় একচেটিয়া দাপটে আছে বেশ কয়েকটি নামিদামি প্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠান গায়ের জোরে বালু ফেলে ভরাট করেছে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের শীতলক্ষ্যার সীমানা। রূপগঞ্জের বুক চিরে বয়ে যাওয়া নদীর দু’পাশেই এখন বসত করছে অবৈধ দখলদার।
সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, রূপগঞ্জের তারাব ও ডেমরায় অবৈধ দখলদারদের কবলে চলে গেছে সুলতানা কামাল সেতুর দু’পাড়।
প্রভাবশালী স্থানীয়রা প্রশাসনকে ম্যানেজ করে রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় সেতুটির দু’পাশের নিচের জায়গাগুলোতে এবং শীতলক্ষ্যা নদী ভরাট ও দখল করে নির্বিঘে চালিয়ে যাচ্ছে ইট-বালু এবং কাঠ-বাঁশের ব্যবসা। সুলতানা কামাল সেতুর রূপগঞ্জ অংশে আওয়ামী লীগ নেতা বারেক, বিএনপি নেতা শহীদুল্লাহ, নুরু মিয়া, চনপাড়ায় জয়নাল ডাক্তার, আনোয়ার, কাদির দেলোয়ারসহ ৩০ জনের বালুর গদি রয়েছে। ডেমরা অংশে দাপটের সঙ্গে বালুর ব্যবসা করছে, ডেমরা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবুল বাশার, স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি হাবিবুর রহমান হাসু, ডেমরা ইউনিয়ন যুবলীগের সহ-সম্পাদক ইউনুসসহ আরও ৯ যুবলীগ নেতা, ডেমরা ইউনিয়ন যুবলীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আবদুর রহমান, ডেমরা থানা আওয়ামী লীগের সদস্য মো. মোস্তফা, ডেমরা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ নেতা আলাউদ্দিন, মো. মমিন মিয়া, হাজী মো. আতিকুল রহমান, আবদুল মালেক ডেমরা ইউনিয়ন যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক সালাউদ্দিন, যুবলীগ নেতা. সোহেল, ডেমরা থানা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার আবদুল ওহাব। সরেজমিন গিয়ে জানা যায়, সুলতানা কামাল সেতুর দু’পাড়ের নিচের খালি জায়গা ডেমরা ঘাট ও তারাব এলাকা স্থানীয় দখলদাররা শুরু থেকেই দখল করে তাদের ব্যবসা পরিচালনা করে আসছে। নিয়ম বহির্ভূত জেনেও স্থানীয়রা রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় এবং প্রশাসনকে ম্যানেজ করে দিব্যি চালিয়ে যাচ্ছে তাদের ব্যবসা। এ ব্যাপারে বিশিষ্ট সমাজসেবক লায়ন মোজাম্মেল হক বলেন, ‘এ নিয়ে সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা চিন্তিত নন। যদি তারা কার্যকর পদক্ষেপ নিতেন, তাহলে এভাবে নদী দখল উৎসবে মেতে উঠতে পারত না দখলদাররা।’ নদী দখলের ব্যাপারে তারাব এলাকার দখলদার আওয়ামী লীগ নেতা বারেক বলেন, ‘বাপ-দাদাগো জায়গাই আমরা দখল করছি, এইডা অন্যায় কিসের? তাছাড়া আমরা সব খানে টাকা দিয়া ব্যবসা করি।’ রূপসী এলাকার দখলদার কাদের বলেন, ‘আমি বালু ব্যবসা করি। নদী দখল করি নাই।’ রূপসী এলাকার আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘সরকারের কাছ থেকে লিজ নিয়া বালু ব্যবসা করছি, এখানে অবৈধ কোনো বিষয় নেই।’ রূপগঞ্জের ফেরিঘাটের পার্শ্ববর্তী লীনা পেপার মিল, ক্রিস্টাল সল্ট নদী দখল করে রেখেছে। নদীর পশ্চিম প্রান্তে কাজী আ. হামিদ উচ্চবিদ্যালয়ের সীমানাপ্রাচীর, আওয়ামী লীগ নেতা তারিকের বাড়ি ও উপজেলা পোস্ট অফিসের সীমানাপ্রাচীরও রয়েছে নদীগর্ভের সীমানায়। দখলে বাদ নেই রূপগঞ্জ ইউনিয়ন ও দাউদপুর ইউনিয়ন এলাকাও। নদীপাড়ের দু’কূল ঘেঁষেই অবৈধ ৩৬টি ইটভাটার মালিকরা ও আশকারী জুট মিল ও মাশরীকি জুট মিলের সীমানাপ্রাচীর দিয়েও দখলে নিয়েছে রূপগঞ্জ অংশের শীতলক্ষ্যা। এছাড়াও রূপগঞ্জের শীতলক্ষ্যার অংশের কোথাও বৈধ বালুমহাল না থাকলেও বেলদী, কাঞ্চন, ও ভোলাব এলাকায় শতাধিক ড্রেজার বসিয়ে বালু উত্তোলন করতে দেখা যায়। এসব বালুমহাল বিষয়ে জানতে চাইলে স্থানীয়রা জানায়, বেলদী ও কাঞ্চন এলাকায় এসব অবৈধ দখলে ও বালুমহাল পরিচালনা করছে স্থানীয় যুবলীগ নেতাকর্মীরা। অবৈধ দখল বিষয়ে জানতে চাইলে স্থানীয় উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. লোকমান হোসেন জানান, অবৈধ বালুমহাল উচ্ছেদ ও অবৈধ দখল বিষয়ে উচ্ছেদ করার জন্য জেলা প্রশাসকের নির্দেশে একাধিকবার উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে পরিবেশ অধিদফতরের পরিচালক (এনফোর্সমেন্ট) মোহাম্মদ মুনীর চৌধুরী জানান, শীতলক্ষ্যা নদী পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা। বিধায় এখানে এ জাতীয় স্থাপনা-অবকাঠামো নির্মাণ সম্পূর্ণ বেআইনি ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ। বিআইডব্লিউটিএ নারায়ণগঞ্জের উপ-পরিচালক গোলাম মোস্তফা বলেন, ‘শীতলক্ষ্যা নদী দখল করে যারা ব্যবসা চলাচ্ছে তাদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে নৌ আদালতে মামলা রয়েছে।’


0 comments:
Post a Comment