যানজটের পেছনে আধা যুগ + সম্ভাবনা
চলতে চলতে আটকে গেছেন, তার পরই শিখেছেন। একটা বাস ইউটার্ন নিলে কতটা জায়গা লাগে তা শিখেছেন মৌচাক মোড়ে দাঁড়িয়ে। আধা যুগ ধরে আঠার মতো লেগে আছেন যানজটের পেছনে। গাঁটের পয়সা খরচ করে ঢাকাকে যানজটমুক্ত করতে মাস্টার প্ল্যান তৈরি করেছেন। তিনি জুরাইনের আসাদুর রহমান মোল্লা। লিখেছেন ইমরান উজ-জামান
অঅ-অ+
আসাদের বয়স এখন ৪৭ বছর। নটর ডেম কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাস করে সিটি কলেজ থেকে বিএসসি করেছেন। এরপর উট মার্কা ঢেউটিন কম্পানিতে কাজ করেছেন। কিছুদিন ছিলেন কনস্ট্রাকশন ব্যবসায়ী। এখন কাপড়ের ব্যবসা করেন। চার ভাই ও দুই বোনের মধ্যে তিনিই বড়। বাবা ছিলেন হাম্মাদিয়া স্কুলের শিক্ষক। ১৯৯৬ সালে বাবা মারা গেলে আসাদ পরিবারের হাল ধরেন। বাবার রেখে যাওয়া জমিতে বাড়ি তুলে নিচতলার দুটি ঘর যানজট প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ করেছেন। ঘরগুলোয় ঢাকার বিভিন্ন এলাকার মানচিত্র আর যানজট নিরসনের উপায়সংবলিত ত্রিমাত্রিক মডেল শোভা পাচ্ছে। মডেল তৈরি করতে একজন আর্কিটেক্ট বন্ধুর সাহায্য নিয়েছেন। নকশাগুলোর বড় বড় প্রিন্টও করিয়েছেন, নিজের পয়সায়। গোড়ায় ভাই-বোন সবাই এটিকে পাগলামি হিসেবে দেখেছিল। কিন্তু সায়েন্স ল্যাবরেটরি মেলায় পুরস্কার পেয়ে সমীহ আদায় করেছেন। প্রাইজমানি পেয়েছিলেন ৩০ হাজার টাকা। তখন মা বলেছিলেন, খরচের টাকা তো উঠেছে, এবার বাদ দে। কিন্তু আসাদের যে নেশা ধরে গেছে। সমানতালে ছোটাছুটি করছেন ডিএমপিতে, সিটি করপোরেশনে। কখনো কখনো বুয়েটে।
শুরুর দিন
ইসলামপুরে আসাদের কাপড়ের দোকান। জুরাইনের বাসা থেকে ইসলামপুর বড়জোর ১০ কিলোমিটার। সময় লাগার কথা বেশির থেকে বেশি ৩০ মিনিট।
অথচ কোনো কোনো দিন দুই ঘণ্টা ফউত হয়ে যায়। কাহাতক আর ভালো লাগে! এত কর্মঘণ্টা ভাগাড়ে ফেলতে আসাদের ভালো লাগে না।
অথচ কোনো কোনো দিন দুই ঘণ্টা ফউত হয়ে যায়। কাহাতক আর ভালো লাগে! এত কর্মঘণ্টা ভাগাড়ে ফেলতে আসাদের ভালো লাগে না।
একদিন দয়াগঞ্জে আটকে ঘামছিলেন। ট্রাফিক কিছুই সামলে উঠতে পারছিলেন না। আসাদ রাস্তায় নেমে ডান দিকের একটা গাড়িকে বাঁয়ে ঘুরিয়ে দিতে চাইলেন। ট্রাফিক মহাবিরক্ত-যান তো ভাই, মাতব্বরি কইরেন না। আসাদ বলল, দিন না ঘুরিয়ে, দেখুন ম্যাজিকের মতো কাজ হবে। ট্রাফিক তেমনটি করলে সত্যি জট ছেড়ে গিয়েছিল। ট্রাফিক বললেন, 'বুদ্ধিটা ওপরের কর্তাদের দিন। আমরা হুকুমের লোক। আপনি ডিএমপিতে যান।'
চিন্তায় পড়ে গেলেন আসাদ। ডিএমপিকে (ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ) মুখে বললে কোনো কাজ হবে না। পুরো শহরটাকে সাজাতে হবে। সব কিছু গুছিয়ে নকশা করতে হবে। তিনি নিজে পরিষ্কার, গাড়ি চলাচল পদ্ধতিতে সংস্কার আনলে যানজট থাকবে না ঢাকায়।
সমাধানের নাম ওয়ান ওয়ে
ভারী গাড়ি চালানোর অভিজ্ঞতা আছে জুলফিকার আলীর। আসাদদের পারিবারিক বন্ধু। জুলফিকার ভাই কোনো রাস্তার নাম বললে প্রস্থ বলে দিতে পারেন। ওই রাস্তার কোন বাঁকে কতটা দৈর্ঘ্যের গাড়ি ইউটার্ন করতে পারবে তাও জানেন। আসাদ সঙ্গে রাখেন জুলফিকার ভাইকে। ঘুরে বেড়ান ঢাকা শহর। সব দেখে সিদ্ধান্ত নিলেন, ঢাকার আপৎকালীন সমাধান হলো ওয়ানওয়ে।
বাধাহীনভাবে গাড়ি চলাচল নিশ্চিত করতে পারলে নগরে কোনো যানজট থাকবে না। বিআরটিএর ম্যাপ দেখে তৈরি করলেন ঢাকার ট্রান্সপোর্ট মহাপরিকল্পনা। তাঁর পরিকল্পনামতে, ঢাকার প্রতিটি পথ হয়ে যাবে একমুখী। নগরের দুই হাজার ৬০০ কিলোমিটার প্রধান সড়কে কোনো রিকশা চলাচল করবে না। তবে মহল্লা ও সংযোগ সড়কগুলোতে রিকশা আর ছোট ছোট যান চলতে পারবে। বাসস্ট্যান্ডগুলো নগরের বাইরে নিয়ে যেতে হবে। যেমন পূর্বাঞ্চলের বাসস্ট্যান্ড হবে সাইনবোর্ড। দক্ষিণ অঞ্চলের জন্য পোস্তগোলা ব্রিজের দক্ষিণ পাড়ে আর উত্তরাঞ্চলের জন্য টঙ্গী।
যেখানে-সেখানে গাড়ি থামানো চলবে না
নগর পরিবহনের গাড়িগুলো যেখানে-সেখানে খুশিমতো যাত্রী ওঠানামা করায়। যানজটের এটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। বাস স্টপেজ নির্দিষ্ট করে দেওয়া হবে। এ জন্য স্টপেজে সিঁড়ি রাখা হবে। বাসের নিজের কোনো সিঁড়ি থাকবে না। স্টপেজে গাড়ির মেঝের সমান উঁচু বেদি করে দিতে হবে। ফলে ইচ্ছেমতো ওঠানামা করা সম্ভব হবে না।
সারা শহরে কয়েকটি স্থানে ওভারহেড ইউটার্নের ব্যবস্থা করতে হবে। যান চলাচল একমুখী হওয়ার কারণে ট্রাফিক সিগনাল সিস্টেম থাকবে না শহরে। পথচারীও ইচ্ছামতো রাস্তা পার হতে পারবেন না আর চালক নির্ধারিত পথের বাইরে গাড়ি চালাতে পারবেন না। প্রস্তাবনা তৈরির পর নানাজনকে দেখালেন। বিশেষজ্ঞজনের পরামর্শ মতো যোজন-বিয়োজন করলেন। যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ড. সালেহ উদ্দীন আহমদের পরামর্শমতো ২০১২ সালে প্রস্তাবনা জমা দিলেন ডিএমপি, যোগাযোগ মন্ত্রণালয় ও ঢাকা ট্রান্সপোর্ট কো-অর্ডিনেশন বোর্ডের (এখন অথিরিটি) কাছে।
ডিএমপি ও বুয়েটের মূল্যায়ন
ডিএমপির ট্রাফিক পুলিশের সাবেক যুগ্ম কমিশনার মাহবুবুর রহমান একবার ডেকে পাঠিয়েছিলেন আসাদকে। ওয়ানওয়ে পদ্ধতি নিয়ে তাঁরা বিশদ আলোচনা করেন। রহমান সাহেব বুঝতে পারলেন, এই পরিকল্পনার দুটি সুবিধা আছে-খরচ কম, সময়ও বেশি লাগবে না। তিনি এর বাস্তবায়ন চাইছিলেন দ্রুতই। কিন্তু দুঃখের বিষয়, হঠাৎই ঢাকার বাইরে তিনি বদলি হয়ে যান। আটকে যায় পরিকল্পনা।
বুয়েটের শহর অ্যাডভাইজরি বোর্ড ডেকে পাঠিয়েছিল আসাদকে। তারা আসাদের বৈজ্ঞানিক ও আর্কিটেকচারাল বিষয়গুলো বুঝতে চাইল। আসাদ জানালেন, পরিকল্পনায় গুগল ও সরকারি মানচিত্র ব্যবহার করেছেন তিনি। কোনো জায়গা বুঝতে সমস্যা হলে সে জায়গায় সরেজমিনে গেছেন। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিয়ে পরে নকশা চূড়ান্ত করেছেন। সব দেখে নিয়ে বুয়েট বলেছে, পরিকল্পিত ও সুন্দর প্রস্তাবনা। অল্প খরচে বাস্তবায়নযোগ্যও বটে। একই সঙ্গে এ কথাও বলেছে যে আসাদ এ বিষয়ে যেহেতু বিশেষজ্ঞ নন, তাই বাস্তবায়ন করতে যাওয়ার আগে বিশেষজ্ঞ দল গঠন করে পুরোটা খতিয়ে দেখা দরকার।
অর্জন
বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদের বিজ্ঞান ও শিল্প-প্রযুক্তি মেলা ২০১৫-এর স্বশিক্ষিত বিভাগে প্রথম স্থান অধিকার করে জুরাইনের আসাদুর রহমান মোল্লার উদ্ভাবিত সিস্টেম। বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদের পুরস্কার পাওয়ার পর ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন তাঁর পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে। প্রাথমিক পর্যায়ে এয়ারপোর্ট রোডকে আসাদ-পদ্ধতির আওতায় আনা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞ মতামত
প্রফেসর নজরুল ইসলাম
নগরবিদ
আমি প্রস্তাবনার বিভিন্ন দিক দেখলাম। সারা ঢাকা যদি ওয়ানওয়ে করা যায়, তাহলে জ্যাম থাকবে না-এটা ধরে নেওয়া যায়। যেহেতু মূল রাস্তায় বাস, ট্যাক্সি আর মোটর ভেহিকল চলবে, তাই অনেকটাই উপকার হবে। আসাদের সঙ্গে র্যাপিড ট্রানজিট পদ্ধতির কিছু মিল আছে। পরিকল্পনাটা নিয়ে ভাবা যায়।
ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদযোগাযোগ বিশেষজ্ঞ
আমাদের শহরের বেশির ভাগ ট্রান্সপোর্ট সিস্টেমই ফেস টু ফেস। এ পদ্ধতি বড় শহরগুলোতে পুরনো হয়ে গেছে। সেখানে দুই রাস্তার মধ্যে রীতিমতো পার্ক আছে। মানুষ সেই পার্কে বসে অবকাশ যাপন করে। আমাদের দেশের যোগাযোগব্যবস্থা নিয়ে তেমন কোনো গবেষণা হয়নি। আমরা যাঁরা পরিকল্পনার সঙ্গে জড়িত, তাঁরা এ বিষয়ে ভাবিনি। যেখানে যাতায়াতের জন্য ২৫ শতাংশ জায়গার প্রয়োজন, সেখানে আছে ১০-১২ শতাংশ। তাই ঢাকার এই চেহারা আজকে। আমি আসাদের প্রস্তাবনা মন দিয়ে দেখেছি। উন্নত বিশ্বের বড় বড় শহরে এই পদ্ধতি চালু আছে। সারা ঢাকা নিয়ে ভাবলে এই প্রক্রিয়া চালু করা খুব কঠিন। লক্ষ করলে দেখা যাবে, আমাদের ঢাকার সব রাস্তা উত্তর-দক্ষিণে লম্বালম্বি। পূর্ব-পশ্চিমে সংযোগ সড়ক খুব কম। এ পরিস্থিতিতে কোনো পদ্ধতিই কাজে আসছে না। তা ছাড়া ঢাকার যোগাযোগব্যবস্থা উন্নয়নে নানামুখী পরিকল্পনা করা হচ্ছে, ঠিক সমন্বিত বলা যাবে না। আসাদের পদ্ধতি এরিয়া ওয়াইজ কাজে লাগানো যেতে পারে এবং এর সুবিধা পাওয়া সম্ভব। এ পদ্ধতি চালু হলে ফেস টু ফেস কোনো দুর্ঘটনা ঘটবে না। গাড়ির গতি থেমে যাবে না। পলিউশনও কমবে। তবে গ্রাউন্ডবেজ পরিকল্পনা হওয়ার কারণে কিছু কিছু জায়গায় ইউলুপ (গাড়ি ডান দিকে টার্ন নেওয়ার জন্য ইউ আকৃতির বাঁকানো পথ) করতে হবে। সেটিও খুব খরচের ব্যাপার নয়। আমি বলব, কিছু এলাকায় এ পদ্ধতি পরীক্ষামূলকভাবে চালু করে দেখা যেতে পারে।

0 comments:
Post a Comment