Friday, October 16, 2015

সিজারিয়ান অপারেশনের নামে গলাকাটা বাণিজ্য


সিজারিয়ান অপারেশনের নামে গলাকাটা বাণিজ্য

আবুল খায়ের১৪ অক্টোবর, ২০১৫ ইং ০০:৩৬ মিঃ
সিজারিয়ান অপারেশনের নামে গলাকাটা বাণিজ্য
সারাদেশে সরকারিভাবে প্রসূতিদের জন্য চিকিত্সা ব্যবস্থা রয়েছে। দেশের প্রতিটি ওয়ার্ডে মা ও শিশু স্বাস্থ্যসেবার জন্য কমিউনিটি ক্লিনিক রয়েছে। এছাড়া উপজেলায় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, জেলায় জেনারেল হাসপাতাল রয়েছে। কোন কোন জেলায় আবার মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালও রয়েছে।
এছাড়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মা ও শিশু স্বাস্থ্যসেবায় অনবদ্য অবদান রাখায় আন্তর্জাতিক পুরস্কার পেয়েছেন। তবে এসবের পরেও সারাদেশে সিজারিয়ান অপারেশনের নামে গলাকাটা বাণিজ্য করছেন একশ্রেণির চিকিত্সক এবং ক্লিনিক।
তাদের গাইনি চিকিত্সায় কোন অভিজ্ঞতা নেই। অ্যানেসথেশিয়া (অজ্ঞান করা) বিষয়ে কোন উচ্চতর প্রশিক্ষণ নেই। টাকার লোভে তারা সিজারিয়ান অপারেশন করে থাকে। সরকারি হাসপাতালের কিছু ডাক্তারও এসবের সঙ্গে জড়িত। উপজেলা পর্যায়ে এগুলো বেশি হয়। অনভিজ্ঞ ডাক্তাররা স্পাইনাল কর্ডে অ্যানেসথেশিয়া দিয়ে অপারেশন করে যাচ্ছে। অনেক সময় হাতুড়ে ডাক্তারও প্রসূতির অপারেশন করছে। কোন কোন সময় নার্সরাও অপারেশন করছে।
গাইনি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. রাশিদা বেগম এ প্রসঙ্গে বলেন, ১০০ প্রসূতির মধ্যে ১৫ থেকে ২০ ভাগও সিজারিয়ান হয় না। ৮০ ভাগেরই নরমাল ডেলিভারি হয়। নিয়ম হচ্ছে প্রসূতি মায়েরা একজন গাইনি বিশেষজ্ঞের পর্যবেক্ষণে থাকবে। কোন সমস্যা হলে সেই গাইনি ডাক্তার পরামর্শ দেবে সিজারিয়ান অপারেশন করা বা না করার বিষয়ে।
এ ধরনের ক্লিনিকে পাঠিয়ে কমিশন পাচ্ছেন একশ্রেণির ডাক্তার। এছাড়া প্রসূতিদের ক্লিনিকে ভাগিয়ে নেয়ার জন্য তাদের ভেতনভোগী দালালও রয়েছে সরকারি হাসপাতালে। স্বাস্থ্য অধিদফতরের শীর্ষ কর্মকর্তারা এর সত্যতা স্বীকার করেছেন। 
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সরকারি হাসপাতালে গেলেও প্রসূতি মায়েদের পাঠিয়ে দেয়া হয় ক্লিনিকে। এসব ক্লিনিকে অত্যাধুনিক কোন ব্যবস্থা নেই। উন্নত যন্ত্রপাতি, আইসিইউ এবং ইনকিউবেটর থাকার কথা থাকলেও তা নেই। 
উপজেলা পর্যায়ে ৯৫ ভাগ ক্লিনিকের কোন লাইসেন্স নেই। অনেকের লাইসেন্স থাকলেও নবায়ন করা হয় না অনেক দিন ধরে। স্থানীয় স্বাস্থ্য প্রশাসনও এসব পর্যবেক্ষণ করে না। অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয় স্বাস্থ্য প্রশাসনের একশ্রেণির অসাধু কর্মকর্তা এসব ক্লিনিক থেকে মাসোহারা পায়। ফলে এসব অবৈধ ক্লিনিকের কার্যক্রম দেখেও না দেখার ভান করে।
র্যাব সদর দফতর থেকে জানানো  হয়, প্রতিমাসে অভিযান চালিয়ে অনেক অবৈধ ক্লিনিক বন্ধ করে দেয়া হয়। তবে মালিকরা আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে বের হয়ে আসে। রাজধানীর লালমাটিয়ায় ৪ অক্টোবর তিন নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় সিলগালা করে দেয়া হয় এশিয়ান কার্ডিয়াক অ্যান্ড জেনারেল হাসপাতাল। এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুল্লাহ আল আহাদ ও দুই চিকিত্সককে দু’দিন করে রিমান্ডে পাঠিয়েছে আদালত।
এদিকে গত কয়েক দিনে নওগাঁ জেলার ১৫টি অবৈধ ক্লিনিক বন্ধ করে দিয়েছে স্থানীয় সিভিল সার্জন অফিস। ওই অভিযানে নিয়ামতপুর উপজেলার ৫টি, পত্নীতলা উপজেলার ৩টি, বদলগাছি উপজেলার ১টি, মহাদেবপুর উপজেলার ১টি এবং সদর উপজেলার ৪টি অবৈধ ক্লিনিক বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। সিভিল সার্জন ডা. মোজাহার হোসেন এ প্রসঙ্গে বলেন, অবৈধ ক্লিনিকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ অব্যাহত আছে।
পটুয়াখালী প্রতিনিধি জানান, এই এলাকায় যত্রতত্র গড়ে উঠেছে ক্লিনিক। এগুলো শতভাগ শর্ত পালন করতে পারছে না। কোন কোন ক্লিনিকে ডাক্তারের দায়িত্ব পালন করেন মেডিক্যাল সহকারী। জেলার ক্লিনিকের বেশিরভাগের লাইসেন্স নবায়ন করা হয় না। প্রসূতি রোগী ভর্তি হলেই সিজারিয়ান করার পরামর্শ দেয়া হয়।
ঝিনাইদহ থেকে ভ্রাম্যমাণ প্রতিনিধি জানান, ঝিনাইদহ জেলার বিভিন্ন স্থানে ব্যাঙের ছাতার মত গড়ে ওঠা প্রাইভেট ক্লিনিকে গত দুই মাসে অপচিকিত্সায় ১০ জন প্রসূতি মারা গেছে। মহেশপুর উপজেলার ভৈরবা বাজারের জননী নামের একটি প্রাইভেট হাসপাতালে অপচিকিত্সায়  ৮ জন প্রসূতি ও এক যুবকের মৃত্যু হয়েছে। মহেশপুর থানায় অপারেশনকারী দুই ডাক্তারের বিরুদ্ধে একটি ও শৈলকুপা থানায় এক ডাক্তার ও হাসপাতাল মালিকের বিরুদ্ধে একটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে।   
সিভিল সার্জন আব্দুস সালাম জানান, হাতেগোনা দুই একটি ছাড়া কোন প্রাইভেট হাসপাতাল নিয়ম মেনে চালানো হচ্ছে না। সার্জারির ডাক্তার ছাড়া হরহামেশা অপারেশন করা হচ্ছে।  অজ্ঞানকারী ডাক্তার ছাড়াই যে কেউই স্পাইনাল কর্ডে ইনজেকশন দিয়ে রোগীকে অজ্ঞান করছে। অপারেশনের পর রোগীকে ফলোআপ করা হয় না।
তিনি বলেন, প্রতিটি মৃত্যুর ঘটনার পর তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। লোকবল না থাকায় প্রাইভেট হাসপাতালগুলোতে তদারকি করা সম্ভব হয় না। তিনি বলেন, মহেশপুরের জননী ও শৈলকুপার আয়েশা হাসপাতালসহ ১২টি প্রাইভেট হাসপাতাল সিলগালা করে দেয়া হয়েছে। প্রতিটি ঘটনার তদন্ত করে দোষী ডাক্তারদের বিরুদ্ধে শাস্তির ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সুপারিশ করে তদন্ত প্রতিবেদন ঊর্ধতন কর্তৃপক্ষকে পাঠানো হয়েছে। এখন পর্যন্ত সুপারিশ বাস্তবায়ন করা হয়নি বলে তিনি জানান।
সারাদেশে বিভিন্ন জেলা এবং উপজেলা প্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অবৈধ অনেক ক্লিনিক রয়েছে। প্রসূতি মায়েদের সিজারিয়ান করা একধরনের বাণিজ্যে পরিণত হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিচালক (হাসপাতাল) সামিউল ইসলাম বলেন, সারাদেশে অভিযান চালিয়ে গত দেড় মাসে প্রায় ৭০টি অবৈধ ক্লিনিক বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। 
স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম এ প্রসঙ্গে বলেন, দেশব্যাপী অবৈধ ক্লিনিকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। সিভিল সার্জন এবং স্থানীয় স্বাস্থ্য প্রশাসনকে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে এসব ক্লিনিক বন্ধ করাসহ জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদফতর থেকে এসকল নির্দেশনা সংবলিত চিঠি সারাদেশের সিভিল সার্জন অফিস এবং স্থানীয় স্বাস্থ্য প্রশাসনের কাছে পাঠানো হয়েছে বলেও জানান তিনি।

0 comments:

Post a Comment

Advertisement

 

Copyright 2008 All Rights Reserved Revolution Two Church theme by Brian Gardner Converted into Blogger Template by Bloganol dot com