Friday, October 16, 2015

রাজনীতির হালচাল - নেতারা দেশে কামান, বিদেশে নেন



রাজনীতির হালচাল - নেতারা দেশে কামান, বিদেশে নেন

নঈম নিজাম

নীল আকাশে চাঁদের লুকোচুরি চাঁদ ভাবছে আজ মেঘ নেই, আকাশ ভরা থাকবে তারার খেলায় দুনিয়া আচ্ছন্ন থাকবে জ্যোৎস্নার আলোতে কিন্তু প্রকৃতি নিষ্ঠুর বাড়াবাড়ি রকমের সৌন্দর্যে প্রকৃতি মুগ্ধ থাকতে পারে না তাই ভরা জ্যোৎস্না ঢেকে যায় মেঘের আড়ালে আলো-অাঁধারির খেলা চলে তখন অতি ভালো কখনোই ভালো নয় অন্ধকার নামতে পারে যে কোনো সময় পরিবারে, সমাজে, রাষ্ট্রে ঝড় উঠতে কতক্ষণ অথচ বাস্তবতা কেউ বুঝতে নারাজ এবার আলো-অাঁধারিতে জ্যোৎস্না দেখেছি নিউইয়র্কে
এর আগে দেশে চাঁদ দেখেছি অনেকবার ছোটবেলায় দুর্গাপূজার সময় চাঁদের উৎসবে মেতেছি হিন্দু বাড়িতে নাড়ু খেতাম বাজি ফোটাতাম আনন্দ হতো ভাগাভাগি আবার আমাদের রোজার ঈদে হিন্দু বাড়ির শিশু-কিশোররা আসত বেলুন ওড়াত সেমাই খেত কিন্তু কোরবানির সময় আসত না ভুলেও কাছে ঘেঁষত না অনেক সময় চাঁদনী রাতে আশপাশের গ্রামে কীর্তন বসত হ্যাজাক লাইটের আলোয় আমরা জটলা করতাম কীর্তনের আগাগোড়া বুঝতাম না কিন্তু যেতাম একবার কীর্তনে একজন গাইলেন শ্যামাসংগীত পরিবেশনের আগে বললেন, কবি নজরুলের লেখা বিস্ময়ে আমার চোখ ছানাবড়া! বলে কী! কবি নজরুল হিন্দুদের জন্য শ্যামাসংগীত লিখেছেন? পরে জেনেছি শুধু শ্যামাসংগীত নয়, কবি লিখেছেন, 'মোরা এক বৃন্তে দুটি কুসুম হিন্দু মুসলমান, মুসলিম তার নয়নমণি, হিন্দু তাহার প্রাণ' কবিতার পর তখনকার মুসলিম পত্রিকাগুলো কবিকে তুলাধোনা করেছে অন্যদিকে গোড়া হিন্দু সমাজ তাকে বর্জন করে কবি নজরুল মনেপ্রাণে ছিলেন অসাম্প্রদায়িক চিন্তার মানুষ অথচ লেখালেখির জীবনে, অনাচারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী রোমান্টিক এই কবি কখনো শান্তি পাননি বার বার সমালোচনায় পড়েছেন কখনো মুসলমানরা, কখনো হিন্দুরা তাকে গালাগাল করেছেন আবুল হাসানের কবিতার মতো নজরুল সবকিছু নীরবে সয়েছেন কষ্টকে করেছেন আলিঙ্গন নীরবে অভিমানে বিদায় নিয়েছেন লেখালেখি থেকে জগৎ-সংসার থেকে কিন্তু কণ্ঠ থেমে থাকেনি অনেক বছর পর কবি নজরুলের সঙ্গে মিল রেখে বাউলসম্রাট শাহ আবদুল করিম আক্ষেপ করেছেন 'আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম' কণ্ঠকে স্তব্ধ করা যায় না শুধু দিনগুলো চলে যায় রেখে যায় মানুষের স্মৃতিগুলো আর সেই স্মৃতিকে লালন করে আমরা প্রতিনিয়ত পুড়ি হৃদয়ের তুষের অনলে

এবার আমাদের গ্রামে পূজা হবে না মালীবাড়ির মানুষ চলে গেছে কুমিল্লা শহরে কুমিল্লা এখনো অসাম্প্রদায়িক পূজার সময় থাকে ব্যাপক জমজমাট ধর্ম-বর্ণ নিয়ে আনন্দ উৎসবে মাথাব্যথা নেই মানুষের ত্রিপুরার সঙ্গে কুমিল্লার সম্পর্ক বিনি সুতার মতো একসময় কুমিল্লায় শচীন দেব বর্মণের সঙ্গে সুরের ঝঙ্কার তুলতেন কবি নজরুল রানীর দীঘি ঠিকই আছে কিন্তু নজরুলের স্মৃতিঘেরা সেই কুমিল্লা কি আছে? কোথায় যেন সুর তাল লয় ক্ষয়ে গেছে মানুষের মায়ার বাঁধনগুলো আলগা হয়ে গেছে বাণিজ্যিকীকরণ পরতে পরতে স্বপ্নজাগানো দিনগুলো চাঁদের সঙ্গে মেঘের লুকোচুরির মতো আড়াল হয়ে যায় নিউইয়র্কে বসে ওসব নিয়ে অনেক ভেবেছি তেমনি এক ভাবনার দিনে ম্যানহাটনে বসে কথা হয় আলম (ছদ্মনাম) নামের চট্টগ্রামের এক ভদ্রলোকের সঙ্গে ১৯৭৯ সালে নিউইয়র্কে গেছেন জাহাজে চড়ে বললেন, ভাই! আমাদের সময় এত ভিসার ঝামেলা ছিল না জাহাজে করে দেশে এসেছি জাহাজকে রেখে আমি পালিয়েছি পরে ইমিগ্যান্টদের জন্য সাধারণ ক্ষমায় কাগজপত্র ঠিক করেছি দেশে গেছি, বিয়ে করেছি সবাইকে নিয়ে এসেছি এখন ছেলে-মেয়েরা বড় হয়েছে তাদেরও সংসার হয়েছে তারা দেশে এখন সেকেন্ড জেনারেশন আমরা ফার্স্ট জেনারেশন কষ্ট করেছি আমাদের দ্বিতীয় প্রজন্ম ভালো আছে তারা মেইন স্টিমে ঢুকে পড়েছে পুলিশ, আর্মিতে চাকরি করছে আইটি সেক্টরে তাদের নামডাক হয়েছে ব্যবসা-বাণিজ্যেও অনেকে সফল এমনকি এখানকার মূলধারার রাজনীতি মিডিয়ায়ও অনেকে বড় মাপের জায়গা করে নিয়েছেন বললাম, দেশের কথা মনে পড়ে না? জবাবে বললেন, মনে পড়ে বলেই আপনাকে দেখে ছুটে এসেছি আপনার পত্রিকা পড়ি টেলিভিশনে আপনার বক্তব্য শুনি বাংলাদেশকে হৃদয়ে লালন করেই বাস করছি এই শহরে বললাম, এত বছর পরেও বাংলাদেশকে মিস করেন? ভদ্রলোক বললেন, বাংলাদেশের ভালো খবরে আমাদের মন ভরে যায় খারাপ খবর হৃদয়ের রক্তক্ষরণ সৃষ্টি করে জীবন-জীবিকার তাগিদে একদিন এসেছিলাম আমেরিকায় এখন মাঝেমধ্যে ভাবী ছেলে-মেয়ে থাকুক ফিরে যাই আমার প্রিয় সাতকানিয়ায় আগের মতো হেঁটে ঘুরব গাঁয়ের মেঠো পথে গড়াগড়ি খাব ধুলাবালিতে নানা টানাপড়েনে আমাদের দেশের মানুষ বিদেশ যান কিন্তু দেশের মায়া ছাড়তে পারেন না

আলম সাহেবের মতো আরেকজনের সঙ্গে পরিচয় ম্যানহাটনের টাইম স্কোয়ারের কাছাকাছি কেএফসিতে ভাবলাম দেশে শুধু ম্যাগডোনাল্ড দেখি কেএফসি তেমন দেখি না কৌতূহল থেকেই খেতে গেলাম ভিতরে পেলাম তিন বাঙালিকে একজন তরুণী বাকি দুজন পুরুষ তারা কাজ করছেন প্রচণ্ড ব্যস্ততা নিয়ে আমাকে দেখে নিজেরাই এগিয়ে এলেন কথা বললেন এর মধ্যে একজন বাংলাদেশ নিয়ে ভাবেন অনেক বেশি তিনি বললেন, নিউইয়র্ক নিয়ে আপনার লেখা পড়েছি আপনি লিখেছেন আমেরিকায় শ্রমিক লীগ, শ্রমিক দল আর প্রচার লীগের কাজ কী? আপনি ঠিক লেখেননি জানতে চাইলাম, ভুলটা কী লিখলাম? তিনি বললেন, ভুলটা হলো বিদেশে সংগঠন করা লাভজনক ব্যবসায় সবাই এতে জড়ায় দেশে কিছু চাওয়া-পাওয়ার জন্য আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে এনআরবির তিনটি ব্যাংক, লিজিং কোম্পানি, বিদ্যুৎ খাতসহ বিভিন্ন ব্যবসা-বাণিজ্য পাওয়া যায় আর বিএনপি এলেও ঠিকাদারি, বিদেশ থেকে সাপ্লাইসহ বিভিন্ন ব্যবসা মেলে তাই তারা বিদেশ শাখা চালান দেশে বাণিজ্য করে বিদেশে অর্থ আনেন আর আমরা পাঠাই অন্যদিকে দেশের নেতারা বিদেশে এলে প্রটোকল পান বাজার-সদাই হয় ডলার, পাউন্ড পাওয়া যায় আর কারণে নেতারা বিদেশে শুধু দল করেন না গ্রুপিংও লাগিয়ে রাখেন ভদ্রলোকের যুক্তির সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করতে পারলাম না বললাম, ভাই! দল করার অধিকার তো সবার আছে তিনি বললেন, যার যার দেশে তার দল করার গণতান্ত্রিক অধিকার আছে ভারত, পাকিস্তান কিংবা অন্য দেশের লোকেরা এখানে এখানকার রাজনীতি করেন আর তা ছাড়া এখানে বসে এখানকার নাগরিকত্ব নিয়ে অন্য দেশের দল করার সুযোগ নেই যুক্তরাষ্ট্রে বসে যারা বাংলাদেশের বিভিন্ন দলের ব্যানার নিয়ে মারামারি করেন তারা ভুল করছেন তাদের বিরুদ্ধে কেউ যদি অভিযোগ করেন, আমেরিকার নাগরিকত্ব নিয়ে এখনো অন্য দেশের রাজনীতি করছেন তাহলে বিপদ হবে আমি বললাম, বিপদের কী দেখছেন? ভদ্রলোক বললেন, বিপদ হলো নাগরিকত্ব নেওয়ার সময় তারা শপথ নেন খাঁটি আমেরিকান কিংবা ব্রিটিশ হবেন অথচ এখন তারা অন্য দেশের ব্যানার নিয়ে মারামারি করছেন হানাহানি করছেন কাজগুলো বাংলাদেশে গিয়ে করলেই পারেন এখানকার সংস্কৃতি হানাহানির নয় তাই কেউ প্রশ্ন তুলতেই পারেন তাহলে তারা কোন দেশের নাগরিক? ভদ্রলোক আরও বললেন, অন্য কোনো দেশের অধিবাসীরা কাণ্ডগুলো বিদেশে করেন না করেন একমাত্র বাংলাদেশের লোকজন

মনে হলো আমরা আমাদের লিমিটটুকু অনেক সময় বুঝি না আর বুঝি না বলেই ঝামেলা তৈরি হয় আরেকজন প্রবাসী আমার কাছে জানতে চান, এবার বাংলাদেশের এমপিরা এত বেপরোয়া কেন? আমি বললাম, সব এমপি নন কিছু কিছু এমপি প্রবাসী ভাই বললেন, কিছু কিছু এমপির কথা আপনারা পত্রিকায় লেখেন সবার কথা লেখেন না খোঁজ নিন সবার ব্যাপারে তাহলে থলের বিড়াল বেরিয়ে আসবে আমি বললাম, সবাইকে দোষারোপ করতে পারেন না সবাই তো এমপি লিটন নন বদির মতো বদ নন আর তা ছাড়া তারা জামায়াতের এলাকার এমপি তাই একটু-আধটু দুষ্টামি হয়তো করছেন দেশে অনেক ভালো এমপিও আছেন প্রবাসী ভাই বললেন, এমপি যখন মাদকসম্রাট হয়ে যান তখন কাকে বিশ্বাস করবেন? ভাই এমন কেন হয়? এর কারণ কী? এবার ভোটাভুটি না হওয়ার কারণেই কি এমন হচ্ছে? সেটি বলুন আমি যুক্তি দিলাম, জানুয়ারি ভোট তো হয়েছে ভদ্রলোক হাসলেন বললেন, আপনি টিভিতেই স্পষ্ট কথা বেশি বলেন আমার সঙ্গে হয়তো মজা করছেন কী ধরনের ভোট এবার হয়েছে বলুন? ১৫৩ আসনে ভোট বলে কিছু ছিল না বিনা ভোটে এমপি আমি বললাম, এর জন্য আপনি ক্ষমতাসীনদের একতরফা দোষারোপ করতে পারেন না ভদ্রলোক বললেন, আমি ক্ষমতাসীনদের একতরফা দোষারোপ করছি না, বরং আওয়ামী লীগের চেয়ে বিএনপি অধিক দায়ী ক্ষমতায় চলে এসেছি দাম্ভিকতায় ছিল বিএনপি কারণে প্রধানমন্ত্রীর টেলিফোনে সাড়া দেননি বিএনপি চেয়ারপারসন দ্বিতীয়ত, ভারত গিয়ে লালগালিচা সংবর্ধনা নিয়ে দেশে এসে ভুলে যেতেন না সবকিছু ভারতের রাষ্ট্রপতির সঙ্গে যে নাটক করা হলো তা কূটনৈতিক শিষ্টাচারে পড়ে না তৃতীয়ত, জামায়াত পাকিস্তানপন্থিদের ছাড়তে পারছে না বিএনপি আর কারণে আওয়ামী লীগ একতরফা ভোটে এখন ক্ষমতায় আমি বললাম, আমেরিকায় বসে দেশের এত খবর কীভাবে পান? ভদ্রলোক হাসলেন বললেন, প্রযুক্তির যুগে সারা পৃথিবী এখন একটি যুক্ত ভিলেজ অনলাইনে সব খবর পাই দেশের টিভি দেখি খবর দেখি, টকশো শুনি খবর পেতে কোনো সমস্যা হয় না আমি তাকে বললাম, ভাই! দেশের প্রতি আপনার ভালোবাসা আমাকে মুগ্ধ করেছে বিদায় নিলাম ভদ্রলোকের কাছ থেকে মনটা একটু এলোমেলোই হলো বাংলাদেশের সাম্প্রতিক সময়ের অনেক ঘটনাই আমার কাছেও প্রশ্নবিদ্ধ মনে হচ্ছে, কোথাও একটা ঝামেলা আছে যা চোখে পড়ছে, আবার পড়ছেও না হয়তো যখন মূল ঝামেলা ধরা পড়বে তখন অনেক দেরি হয়ে যাবে সব উইং খুলে দিয়ে সবার সঙ্গে জটিলতা বাড়িয়ে পরিস্থিতি ঘোলাটে করা যায় সংকট থেকে বের হওয়া যায় না আর একটি ঝামেলা টেনে আনে আরেকটিকে

পাদটীকা : বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে একবার পুলিশ রাস্তা থেকে ধরে নিয়ে গেল তার বিরুদ্ধে অভিযোগ তিনি রাস্তায় দাঁড়িয়ে প্রস্রাব করেছেন পুলিশের সেপাইরা তাকে চিনত না তাই থানায় নিয়ে যায় বেচারা ওসি বিভূতিভূষণের লেখার ভক্ত কিন্তু তিনিও চিনতেন না এই বিখ্যাত লেখককে ওসি প্রশ্ন করলেন, আপনি রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে এভাবে প্রস্রাব করতে গেলেন কেন? লেখক বললেন, না করলে জামাকাপড় নষ্ট হতো আর বেগ ছিল বেশি উপায় ছিল না ওসি জবাবে খুশি হলেন না এবার জানতে চান, মশাই আপনার নাম কী? আপনি কোন জেলার অধিবাসী বিভূতিভূষণ নিজের নাম বললেন জেলার নামও বললেন ওসি দাঁড়িয়ে গেলেন বললেন, আপনি সেই বিখ্যাত লেখক! আমি আপনার লেখার ভক্ত আমার রুমে সুন্দর বাথরুম আছে ব্যবহার করুন জবাবে বিভূতিভূষণ বললেন, যখনকার কাজ তখন করতে হয় আমার জলবিয়োগ করা শেষ এখন আর বিয়োগ করতে পারব না এখন যোগ করা যেতে পারে

লেখক : সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন

- See more at: http://www.bd-pratidin.com/editorial/2015/10/14/111886#sthash.Dg7lRjum.dpuf

0 comments:

Post a Comment

Advertisement

 

Copyright 2008 All Rights Reserved Revolution Two Church theme by Brian Gardner Converted into Blogger Template by Bloganol dot com