Friday, October 16, 2015

হাতবদলে বাড়ে সবজির দাম ভোক্তা কেনেন তিনগুণে


হাতবদলে বাড়ে সবজির দাম ভোক্তা কেনেন তিনগুণে

দেলোয়ার হুসেন, আব্দুল্লাহ কাফি শাহীন মিয়া

কৃষকের ক্ষেত থেকে পাইকারি বাজারপাইকারি বাজার থেকে খুচরা বাজারে সবজির দামে আকাশ-পাতাল ব্যবধান কৃষক পর্যায় থেকে প্রায় দ্বিগুণ দামে পাইকারি বাজারে সবজি বেচাকেনা হচ্ছে পাইকারি বাজার থেকে খুচরা বাজারে দাম বেড়ে যাচ্ছে দ্বিগুণ 
কোনো কোনো ক্ষেত্রে ব্যবধান প্রায় তিনগুণ ফলে একদিকে যেমন রাজধানীর ভোক্তাদের মাত্রাতিরিক্ত দামে সবজি কিনতে হচ্ছে, অন্যদিকে এই চড়া দামের সামান্য অংশ পাচ্ছে উৎপাদনকারী কৃষক


প্রতি হাতবদলে বাড়ে পণ্যের দাম অনেক ক্ষেত্রে কৃষক পণ্যের নায্যমূল্য পাচ্ছে না যুগ যুগ ধরে এই অবস্থা চলে এলেও কৃষকের ভাগ্যের কোনো উন্নতি হচ্ছে না তবে শীত বা গ্রীষ্মকালীন আগাম সবজির ক্ষেত্রে কৃষক কিছুটা বাড়তি মূল্য পেয়ে থাকেন তবে খুচরা পর্যায়ে এসব পণ্যের যে মূল্য শোধ করে তার তিন ভাগের এক ভাগও পান না কৃষক নরসিংদীর শিবপুর, বেলাবো অঞ্চলের কৃষক, সবজির পাইকারি আড়ত কারওয়ান বাজার রাজধানীর বিভিন্ন খুচরা বাজারে খোঁজ নিয়ে এসব তথ্য পাওয়া গেছে

দুর্নীতি দমন কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান কনজুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) প্রেসিডেন্ট গোলাম রহমান বিষয়ে আমাদের সময়কে জানান, আসলে মধ্যস্বত্বভোগী আর বারবার হাতবদলের কারণেই খুচরা বাজারে দাম বেড়ে যায় কারণ খুচরা বিক্রেতাদের দোকান ভাড়া থেকে শুরু করে অনেক খরচ মেটাতে হয় কৃষক যদি সরাসরি খুচরা বাজারে পণ্য সরবরাহ করতে পারত তাহলে কিছুটা হলেও লাভ করতে পারতেন হাতবদল কমলে কৃষক বাঁচবে সরকারকেই উদ্যোগ নিতে হবে
অনুসন্ধানে দেখা যায়, কৃষক খুচরা ভোক্তাদের মধ্যকার পণ্যমূল্য ব্যবধান দুই থেকে তিন গুণ ব্যবধানের ফলভোগী মধ্যস্বত্বভোগীরা ফলে ভোক্তারা চড়া দামে পণ্য কিনলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কৃষক উৎপাদিত পণ্যের নায্যমূল্য পান না মধ্যস্বত্বভোগীদের এই বৃত্ত ভাঙার জন্য বিভিন্ন সময়ে উদ্যোগ নেওয়া হলেও সফল হয়নি পণ্যমূল্য বাড়ার আরও একটি উপসর্গ হয়ে দেখা দিয়েছে চাঁদাবাজি কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের এক অনুসন্ধানে দেখা গেছে, নরসিংদী থেকে একটি ট্রাক ঢাকায় আসতে চার স্থানে চাঁদা দিতে হয় দিনাজপুর থেকে দিতে হয় সাত স্থানে এভাবে সব স্থান থেকেই সবজি বোঝাই ট্রাক আসতে চাঁদা দিতে হয় এসব কারণে পণ্যের দাম বাড়ছে
কৃষককে উৎপাদিত পণ্যের নায্যমূল্য দিতে কৃষি বিপণন অধিদপ্তর গ্রাম থেকে সরাসরি কৃষকদের ঢাকায় এনে ভোক্তাদের কাছে পণ্য বিক্রির একটি উদ্যোগ নেওয়া হয় সেটি সফল না হওয়ায় বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে
গত জুলাইয়ে বন্যার অজুহাতে সবজির দাম বাড়ে কিন্তু বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পরও সবজির দাম কমেনি বরং বেড়েছে তবে প্রতিবছর শীতের আগাম সবজির দাম একটু বেশি থাকলেও এবার অনেক বেশি শীতের আগাম সবজির মধ্যে টমেটো ইতোমধ্যেই বাজারে এসেছে নরসিংদীর শিবপুরে কৃষক জয়নাল আবেদীন জানান, তারা প্রতিকেজি টমেটো বিক্রি করছেন ৫০ থেকে ৬০ টাকায় টমেটো রাজধানীর কারওয়ান বাজারে ৭২ থেকে ৭৫ মোহাম্মদপুর টাউন হল বাজারে বিক্রি হচ্ছে ৯০ থেকে ১১০ টাকা কেজি অর্থাৎ কৃষক যে দামে টমেটো বিক্রি করছেন তার দ্বিগুণ দামে ঢাকার ভোক্তারা কিনছেন 
শিবপুরে কৃষক ফারুক আহমেদ প্রতিকেজি ঢেঁড়স বিক্রি করছেন ২৪ থেকে ২৬ টাকায় ওই ঢেঁড়স কারওয়ান বাজারে পাইকারিভাবে প্রতিপাল্লা ( কেজি) বিক্রি হচ্ছে ১৮৫ টাকায় হিসাবে প্রতিকেজির দাম ৩৭ টাকা বিভিন্ন খুচরা বাজারে মানভেদে ঢেঁড়স বিক্রি হচ্ছে ৬০ থেকে ৭৫ টাকা কেজি অর্থাৎ কৃষক পর্যায় থেকে দাম ব্যবধান তিন গুণ
একই অবস্থা অন্য সবজির ক্ষেত্রে শিবপুরের কৃষকরা পাইকারিভাবে করলা বিক্রি করেন ২৪ থেকে ২৬ টাকায়, কারওয়ান বাজারে বিক্রি হচ্ছে ৪৪ টাকায় আর খুচরা বাজারে ৫৫ থেকে ৬৫ টাকায় কোনো কোনো বাজারে আরও বেশি একইভাবে পটোল প্রতিকেজি ১৮ থেকে ২০ টাকা, কারওয়ান বাজারে ৩২ খুচরা বাজারে তা বিক্রি হচ্ছে ৫৫-৬০ টাকায় বেগুন ২০ থেকে ২২ টাকা, কারওয়ান বাজারে ৩৪ খুচরা বাজারে বিক্রি হচ্ছে ৬০ থেকে ৬৫ টাকা কেজি কচুরমুখি ১০ থেকে ১২ টাকা, কারওয়ান বাজারে ১৮ টাকা এবং খুচরা বাজারে বিক্রি হচ্ছে ৩০ থেকে ৩৫ টাকা কেজি
শীতের নতুন সবজি বাজারে আসতে শুরু করেছে ছোট আকারের বাঁধাকপি শিবপুরে প্রতিপিস ১০ টাকা, কারওয়ান বাজারে ১৫-২০ খুচরা বাজারে ৩০-৩৫ টাকা একই দামে বিক্রি হচ্ছে ছোট আকারের ফুলকপি
কারওয়ান বাজারে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, গ্রাম থেকে সবজি বোঝাই ট্রাক আসার পর থেকে দফা হাতবদল হয় ট্রাক আসার পর নামার আগেই এক দফা বিক্রি হয়ে যায় তারপরে যায় আড়তে ওখানে হাতবদল হয় আরও এক দফা আড়ত থেকে কিনে মধ্যম পর্যায়ের ফড়িয়ারা আবার পাল্লা হিসাবে বিক্রি করেন এদের কাছ থেকে নিয়ে যায় খুচরা ব্যবসায়ীরা এছাড়া আড়ত বদলের নামেও হাতবদলের ঘটনা ঘটে এছাড়া আছেকয়েলি অত্যাচার আড়তের মালিকরা এর ভাগ পেয়ে থাকেন গড়ে প্রতিকেজিতে প্রায় ৫০ পয়সা হারে কয়েলি দিতে হয় এসব কারণে পণ্যের দাম বাড়ে এছাড়া সম্প্রতি পরিবহন ভাড়া বেড়ে গেছে
কাওরান বাজারে পাল্লাপ্রতি দেশি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৩০০ টাকা, কেজিপ্রতি ৬০ টাকা, আমদানিকৃত পেঁয়াজের পাল্লা ২০০ আর প্রতিকেজি ৪০ টাকা এদিকে খুচরা বাজারে দেশি পেঁয়াজের কেজি বিক্রি হচ্ছে ৭৫-৮০ টাকা, আর আমদানিকৃত পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৭০-৭৫ টাকা                                                                                                                                                                                                             
সবজির মধ্যে আলু পাইকারি বাজারে প্রতিপাল্লা ১২০ টাকা, কেজি বিক্রি হচ্ছে ২৪ টাকা খুচরা বাজারে প্রতিকেজি ২৬-২৮ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে আলু পচন কম হয় বলে এর দামে তেমন পার্থক্য হয় না তবে মৌসুমের সময় কৃষক পর্যায়ে আলু বিক্রি হয় থেকে টাকা এখনকার আলু সবই হিমাগার মালিকদের কাছ থেকে আসছে সারা দেশে তারা এজেন্টেদের মাধ্যমে সরবরাহ করছে বলে আলুর বাজারে দামের পার্থক্য কম
কাওরান বাজারের পাইকারি বিক্রেতা রফিকুল ইসলাম খোকন বলেন, আগের তুলনায় সবজির দাম একটু বেশি আমরা লাভ কম করি কিন্তু খুচরা বিক্রেতারা বেশি লাভ করে বলে দাম বেশি
আরেকজন পাইকারি বিক্রেতা শফিকুল ইসলাম জানান, পাইকারি বাজারে হাত বদল হয় আর খুচরা বাজারে যেতে যেতে অনেক সময় - হাত বদল হয় যার কারণে খুচরা বাজারে দাম বেশি পড়ে যায়
এদিকে খুচরা বিক্রেতারা জানান, পাইকারি বাজার থেকে কম দাম পড়লেও গাড়ি ভাড়াসহ অন্যান্য খরচ পরে সবজি নষ্ট হওয়ার ভয় থাকে তাই দাম একটু বেশি রাখতে হয় অনেক সময় শেষের দিকে কেনা দামেও বিক্রি করতে হয় এমনকি অনেক সময় সবজি পচেও যায় এছাড়া পাইকারি বাজার থেকে ওজনে কম দেওয়া হয় সব দিক বিবেচনা করে একটু বেশি দামে বিক্রি করতে হয় 
জানতে চাইলে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডির জ্যেষ্ঠ গবেষক . খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম আমাদের সময়কে বলেন, কেবল খুচরা বিক্রেতাকে দোষারোপ করলে হবে না ক্ষেত্রে সাপ্লাই চেইনকে শক্তিশালী করতে হবে প্রান্তিক কৃষক যদি সরাসরি বাজারে বিক্রি করতে পারত তাহলে কৃষক ন্যায্যমূল্য পেত কিন্তু মাঝ পথে কৃষকের কাছ থেকে যারা পণ্য কিনে নিয়ে আসেন তারাই শক্তিশালী দাম তারাই বাড়ায়
তিনি বলেন, পাইকারি বিক্রেতাদের সংসার খরচ, দোকান ভাড়াসহ অন্যান্য খরচের ওপর দিয়েই নির্ভর করে খুচরা বাজারে এক দোকানের তুলনায় অন্য দোকানে কিন্তু খুব বেশি পার্থক্য হয় না
সরকারিভাবে কৃষিপণ্যের বাজারজাত নিয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠান কৃষি বিপণন অধিদপ্তর সূত্র জানায়, তাদের গবেষণায় দেখা গেছে, বিশেষ করে ঢাকা শহরে স্বল্প দূরত্বে পরিবহন ভাড়া অনেক বেশি, খুচরা ব্যবসায়ীদের দোকান ভাড়া, বাজারের চাঁদা, একটি দোকানে কমপক্ষে তিনজন মানুষ কাজ করে, তাদের মজুরি এসব মিলে খুচরা বাজারে পণ্যের দাম দ্বিগুণের বেশি বেড়ে যায় তারপরও সব বাজারে পণ্যের দাম এক নয় এছাড়া পণ্যের মানেও দামের তারতম্য হয় এসব কারণেও দামে পার্থক্য বেশি 

কৃষক, পাইকারি বাজার খুচরা বাজারে সবজির দামের চিত্র (কেজি/টাকা)
পণ্যের নাম     নরসিংদীর বেলাবো    কারওয়ান বাজার     খুচরা বাজার   
আলু     ১৯ (হিমাগার)    ২৪    ২৫-২৬   
শশা    ১০-১২    ২২-২৩    ৩৫-৪০   
ঢেঁড়স    ২৪-২৬    ৩৭-৩৮    ৬০-৭৫   
করলা    ২৮-৩০    ৫৪-৫৬    ৫৫-৬৫   
পটোল     ১৮-২০    ৩০-৩২    ৫০-৬০   
বেগুন    ২২-২৪    ৩২-৩৪    ৫০-৬০   
কচুরমুখি     ১০-১২    ১৮-২০    ৩০-৩৫   
ঝিঙ্গা    ১৮-২০    ৩০-৩২    ৫০-৫৫   
চিচিঙ্গা     ১৮-২০    ৩২-৩৪    ৫০-৫৫   
টমেটো    ৫০-৬০    ৭০-৭২    ৯০-১১০   
পেঁপে    ১০-১২    ২০-২২    ৩০-৩৫   
কচুরলতি     ১৮-২০    ২৮-৩০    ৪০-৫০   
বরবটি     ৩৮-৪০    ৭০-৭২    ১১০-১২০   
কাঁকরোল     ২২-২৬    ৪৪-৪৬    ৬০-৬৫   
- See more at: http://www.dainikamadershomoy.com/2015/10/17/53412.php#sthash.R0WkjJ9Z.dpufহাতবদলে বাড়ে সবজির দাম ভোক্তা কেনেন তিনগুণে
দেলোয়ার হুসেন, আব্দুল্লাহ কাফি ও শাহীন মিয়া 
কৃষকের ক্ষেত থেকে পাইকারি বাজার, পাইকারি বাজার থেকে খুচরা বাজারে সবজির দামে আকাশ-পাতাল ব্যবধান। কৃষক পর্যায় থেকে প্রায় দ্বিগুণ দামে পাইকারি বাজারে সবজি বেচাকেনা হচ্ছে। পাইকারি বাজার থেকে খুচরা বাজারে দাম বেড়ে যাচ্ছে দ্বিগুণ। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এ ব্যবধান প্রায় তিনগুণ। ফলে একদিকে যেমন রাজধানীর ভোক্তাদের মাত্রাতিরিক্ত দামে সবজি কিনতে হচ্ছে, অন্যদিকে এই চড়া দামের সামান্য অংশ পাচ্ছে উৎপাদনকারী কৃষক। প্রতি হাতবদলে বাড়ে পণ্যের দাম। অনেক ক্ষেত্রে কৃষক পণ্যের নায্যমূল্য পাচ্ছে না। যুগ যুগ ধরে এই অবস্থা চলে এলেও কৃষকের ভাগ্যের কোনো উন্নতি হচ্ছে না। তবে শীত বা গ্রীষ্মকালীন আগাম সবজির ক্ষেত্রে কৃষক কিছুটা বাড়তি মূল্য পেয়ে থাকেন। তবে খুচরা পর্যায়ে এসব পণ্যের যে মূল্য শোধ করে তার তিন ভাগের এক ভাগও পান না কৃষক। নরসিংদীর শিবপুর, বেলাবো অঞ্চলের কৃষক, সবজির পাইকারি আড়ত কারওয়ান বাজার ও রাজধানীর বিভিন্ন খুচরা বাজারে খোঁজ নিয়ে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। 
দুর্নীতি দমন কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান ও কনজুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) প্রেসিডেন্ট গোলাম রহমান এ বিষয়ে আমাদের সময়কে জানান, আসলে মধ্যস্বত্বভোগী আর বারবার হাতবদলের কারণেই খুচরা বাজারে দাম বেড়ে যায়। কারণ খুচরা বিক্রেতাদের দোকান ভাড়া থেকে শুরু করে অনেক খরচ মেটাতে হয়। কৃষক যদি সরাসরি খুচরা বাজারে পণ্য সরবরাহ করতে পারত তাহলে কিছুটা হলেও লাভ করতে পারতেন। হাতবদল কমলে কৃষক বাঁচবে। সরকারকেই এ উদ্যোগ নিতে হবে। 
অনুসন্ধানে দেখা যায়, কৃষক ও খুচরা ভোক্তাদের মধ্যকার পণ্যমূল্য ব্যবধান দুই থেকে তিন গুণ। এ ব্যবধানের ফলভোগী মধ্যস্বত্বভোগীরা। ফলে ভোক্তারা চড়া দামে পণ্য কিনলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কৃষক উৎপাদিত পণ্যের নায্যমূল্য পান না। মধ্যস্বত্বভোগীদের এই বৃত্ত ভাঙার জন্য বিভিন্ন সময়ে উদ্যোগ নেওয়া হলেও সফল হয়নি। পণ্যমূল্য বাড়ার আরও একটি উপসর্গ হয়ে দেখা দিয়েছে চাঁদাবাজি। কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের এক অনুসন্ধানে দেখা গেছে, নরসিংদী থেকে একটি ট্রাক ঢাকায় আসতে চার স্থানে চাঁদা দিতে হয়। দিনাজপুর থেকে দিতে হয় সাত স্থানে। এভাবে সব স্থান থেকেই সবজি বোঝাই ট্রাক আসতে চাঁদা দিতে হয়। এসব কারণে পণ্যের দাম বাড়ছে। 
কৃষককে উৎপাদিত পণ্যের নায্যমূল্য দিতে কৃষি বিপণন অধিদপ্তর গ্রাম থেকে সরাসরি কৃষকদের ঢাকায় এনে ভোক্তাদের কাছে পণ্য বিক্রির একটি উদ্যোগ নেওয়া হয়। সেটি সফল না হওয়ায় বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। 
গত জুলাইয়ে বন্যার অজুহাতে সবজির দাম বাড়ে। কিন্তু বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পরও সবজির দাম কমেনি। বরং বেড়েছে। তবে প্রতিবছর শীতের আগাম সবজির দাম একটু বেশি থাকলেও এবার অনেক বেশি। শীতের আগাম সবজির মধ্যে টমেটো ইতোমধ্যেই বাজারে এসেছে। নরসিংদীর শিবপুরে কৃষক জয়নাল আবেদীন জানান, তারা প্রতিকেজি টমেটো বিক্রি করছেন ৫০ থেকে ৬০ টাকায়। এ টমেটো রাজধানীর কারওয়ান বাজারে ৭২ থেকে ৭৫ ও মোহাম্মদপুর টাউন হল বাজারে বিক্রি হচ্ছে ৯০ থেকে ১১০ টাকা কেজি। অর্থাৎ কৃষক যে দামে টমেটো বিক্রি করছেন তার দ্বিগুণ দামে ঢাকার ভোক্তারা কিনছেন।  
শিবপুরে কৃষক ফারুক আহমেদ প্রতিকেজি ঢেঁড়স বিক্রি করছেন ২৪ থেকে ২৬ টাকায়। ওই ঢেঁড়স কারওয়ান বাজারে পাইকারিভাবে প্রতিপাল্লা (৫ কেজি) বিক্রি হচ্ছে ১৮৫ টাকায়। এ হিসাবে প্রতিকেজির দাম ৩৭ টাকা। বিভিন্ন খুচরা বাজারে মানভেদে এ ঢেঁড়স বিক্রি হচ্ছে ৬০ থেকে ৭৫ টাকা কেজি। অর্থাৎ কৃষক পর্যায় থেকে দাম ব্যবধান তিন গুণ। 
একই অবস্থা অন্য সবজির ক্ষেত্রে। শিবপুরের কৃষকরা পাইকারিভাবে করলা বিক্রি করেন ২৪ থেকে ২৬ টাকায়, কারওয়ান বাজারে বিক্রি হচ্ছে ৪৪ টাকায় আর খুচরা বাজারে ৫৫ থেকে ৬৫ টাকায়। কোনো কোনো বাজারে আরও বেশি। একইভাবে পটোল প্রতিকেজি ১৮ থেকে ২০ টাকা, কারওয়ান বাজারে ৩২ ও খুচরা বাজারে তা বিক্রি হচ্ছে ৫৫-৬০ টাকায়। বেগুন ২০ থেকে ২২ টাকা, কারওয়ান বাজারে ৩৪ ও খুচরা বাজারে বিক্রি হচ্ছে ৬০ থেকে ৬৫ টাকা কেজি। কচুরমুখি ১০ থেকে ১২ টাকা, কারওয়ান বাজারে ১৮ টাকা এবং খুচরা বাজারে বিক্রি হচ্ছে ৩০ থেকে ৩৫ টাকা কেজি। 
শীতের নতুন সবজি বাজারে আসতে শুরু করেছে। ছোট আকারের বাঁধাকপি শিবপুরে প্রতিপিস ১০ টাকা, কারওয়ান বাজারে ১৫-২০ ও খুচরা বাজারে ৩০-৩৫ টাকা। একই দামে বিক্রি হচ্ছে ছোট আকারের ফুলকপি। 
কারওয়ান বাজারে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, গ্রাম থেকে সবজি বোঝাই ট্রাক আসার পর ৫ থেকে ৬ দফা হাতবদল হয়। ট্রাক আসার পর নামার আগেই এক দফা বিক্রি হয়ে যায়। তারপরে যায় আড়তে। ওখানে হাতবদল হয় আরও এক দফা। আড়ত থেকে কিনে মধ্যম পর্যায়ের ফড়িয়ারা আবার পাল্লা হিসাবে বিক্রি করেন। এদের কাছ থেকে নিয়ে যায় খুচরা ব্যবসায়ীরা। এছাড়া আড়ত বদলের নামেও হাতবদলের ঘটনা ঘটে। এছাড়া আছে ‘কয়েলি’র অত্যাচার। আড়তের মালিকরা এর ভাগ পেয়ে থাকেন। গড়ে প্রতিকেজিতে প্রায় ৫০ পয়সা হারে কয়েলি দিতে হয়। এসব কারণে পণ্যের দাম বাড়ে। এছাড়া সম্প্রতি পরিবহন ভাড়া বেড়ে গেছে। 
কাওরান বাজারে পাল্লাপ্রতি দেশি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৩০০ টাকা, কেজিপ্রতি ৬০ টাকা, আমদানিকৃত পেঁয়াজের পাল্লা ২০০ আর প্রতিকেজি ৪০ টাকা। এদিকে খুচরা বাজারে দেশি পেঁয়াজের কেজি বিক্রি হচ্ছে ৭৫-৮০ টাকা, আর আমদানিকৃত পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৭০-৭৫ টাকা।                                                                                                                                                                                                             
সবজির মধ্যে আলু পাইকারি বাজারে প্রতিপাল্লা ১২০ টাকা, কেজি বিক্রি হচ্ছে ২৪ টাকা। খুচরা বাজারে প্রতিকেজি ২৬-২৮ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। আলু পচন কম হয় বলে এর দামে তেমন পার্থক্য হয় না। তবে মৌসুমের সময় কৃষক পর্যায়ে আলু বিক্রি হয় ৩ থেকে ৫ টাকা। এখনকার আলু সবই হিমাগার মালিকদের কাছ থেকে আসছে। সারা দেশে তারা এজেন্টেদের মাধ্যমে সরবরাহ করছে বলে আলুর বাজারে দামের পার্থক্য কম। 
কাওরান বাজারের পাইকারি বিক্রেতা রফিকুল ইসলাম খোকন বলেন, আগের তুলনায় সবজির দাম একটু বেশি। আমরা লাভ কম করি। কিন্তু খুচরা বিক্রেতারা বেশি লাভ করে বলে দাম বেশি। 
আরেকজন পাইকারি বিক্রেতা শফিকুল ইসলাম জানান, পাইকারি বাজারে ২ হাত বদল হয়। আর খুচরা বাজারে যেতে যেতে অনেক সময় ৪-৫ হাত বদল হয়। যার কারণে খুচরা বাজারে দাম বেশি পড়ে যায়। 
এদিকে খুচরা বিক্রেতারা জানান, পাইকারি বাজার থেকে কম দাম পড়লেও গাড়ি ভাড়াসহ অন্যান্য খরচ ও পরে সবজি নষ্ট হওয়ার ভয় থাকে। তাই দাম একটু বেশি রাখতে হয়। অনেক সময় শেষের দিকে কেনা দামেও বিক্রি করতে হয়। এমনকি অনেক সময় সবজি পচেও যায়। এছাড়া পাইকারি বাজার থেকে ওজনে কম দেওয়া হয়। সব দিক বিবেচনা করে একটু বেশি দামে বিক্রি করতে হয়।  
জানতে চাইলে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডির জ্যেষ্ঠ গবেষক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম আমাদের সময়কে বলেন, কেবল খুচরা বিক্রেতাকে দোষারোপ করলে হবে না। এ ক্ষেত্রে সাপ্লাই চেইনকে শক্তিশালী করতে হবে। প্রান্তিক কৃষক যদি সরাসরি বাজারে বিক্রি করতে পারত তাহলে কৃষক ন্যায্যমূল্য পেত। কিন্তু মাঝ পথে কৃষকের কাছ থেকে যারা পণ্য কিনে নিয়ে আসেন তারাই শক্তিশালী। দাম তারাই বাড়ায়। 
তিনি বলেন, পাইকারি বিক্রেতাদের সংসার খরচ, দোকান ভাড়াসহ অন্যান্য খরচের ওপর দিয়েই নির্ভর করে। খুচরা বাজারে এক দোকানের তুলনায় অন্য দোকানে কিন্তু খুব বেশি পার্থক্য হয় না। 
সরকারিভাবে কৃষিপণ্যের বাজারজাত নিয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠান কৃষি বিপণন অধিদপ্তর সূত্র জানায়, তাদের গবেষণায় দেখা গেছে, বিশেষ করে ঢাকা শহরে স্বল্প দূরত্বে পরিবহন ভাড়া অনেক বেশি, খুচরা ব্যবসায়ীদের দোকান ভাড়া, বাজারের চাঁদা, একটি দোকানে কমপক্ষে তিনজন মানুষ কাজ করে, তাদের মজুরি এসব মিলে খুচরা বাজারে পণ্যের দাম দ্বিগুণের বেশি বেড়ে যায়। তারপরও সব বাজারে পণ্যের দাম এক নয়। এছাড়া পণ্যের মানেও দামের তারতম্য হয়। এসব কারণেও দামে পার্থক্য বেশি।  

কৃষক, পাইকারি বাজার ও খুচরা বাজারে সবজির দামের চিত্র (কেজি/টাকা) 
পণ্যের নাম     নরসিংদীর বেলাবো    কারওয়ান বাজার     খুচরা বাজার    
আলু     ১৯ (হিমাগার)    ২৪    ২৫-২৬    
শশা    ১০-১২    ২২-২৩    ৩৫-৪০    
ঢেঁড়স    ২৪-২৬    ৩৭-৩৮    ৬০-৭৫    
করলা    ২৮-৩০    ৫৪-৫৬    ৫৫-৬৫    
পটোল     ১৮-২০    ৩০-৩২    ৫০-৬০    
বেগুন    ২২-২৪    ৩২-৩৪    ৫০-৬০    
কচুরমুখি     ১০-১২    ১৮-২০    ৩০-৩৫    
ঝিঙ্গা    ১৮-২০    ৩০-৩২    ৫০-৫৫    
চিচিঙ্গা     ১৮-২০    ৩২-৩৪    ৫০-৫৫    
টমেটো    ৫০-৬০    ৭০-৭২    ৯০-১১০    
পেঁপে    ১০-১২    ২০-২২    ৩০-৩৫    
কচুরলতি     ১৮-২০    ২৮-৩০    ৪০-৫০    
বরবটি     ৩৮-৪০    ৭০-৭২    ১১০-১২০    
কাঁকরোল     ২২-২৬    ৪৪-৪৬    ৬০-৬৫    
source - daily Amader Somoy


0 comments:

Post a Comment

Advertisement

 

Copyright 2008 All Rights Reserved Revolution Two Church theme by Brian Gardner Converted into Blogger Template by Bloganol dot com